মূচ্ছর্না
সেই কবিতাটার মতো, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আমরা দুজন এক গাঁয়ে থাকি সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ। তোমার আমার যতবার দেখা হয়েছে, যতবার আলাপে নিমগ্ন থেকেছি, কোনও না কোনভাবে কবিতাটা আমাদের মাঝে উঠে এসেছে। সে এক লাইন বললে আমি পরের লাইন বলেছি, আমি একটা উপমা দিলে দিয়েছ অন্যটি। কর ভাটার মতো মধুর হয়ে উঠেছে আমাদের সম্পর্ক। পাড়া প্রতিবেশীর চোখ সয়ে গেছে সেই ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে। খারাপ আলোচনা করে নিজেদের কলুষিত করে নি। আত্মিয় স্বজন বলেছে, দেখো, এতো ভালো সম্পর্ক কিন্তু সবসময় ভালো থাকে না। সজিব তোমার দশা শেষে একরাত্রী গল্পের ভাংগা ইস্কুলের সেকেন্ড মাষ্টারের মত না হয়। তোমার সুরভী শেষে সুরবালা হয়ে না যায়। হেসে বলতাম ধ্যুত ওর সাথে আমার তেমন সম্পর্ক নাকি। একসাথে বড় হয়েছি, খেলেছি। সবচেয়ে বড় কথা এক মানসিকতার মধ্যে এক ধরণের ভালোলাগা একই ধরনের সুরের প্রবাহ। কথা বলতে হয় না একটু আবাসেই বুঝতে পারে আমার মাভাব, গল্প হয় সেই সূত্র ধরে। মন খারাপ —থাকলে সেদিন দেখা যায় সেও চুপ থাকে মোটেই উল্টাপল্টা বলে মনকে আরও ভারী করে তোলে না। একি প্রেম, একি ভালোবাসা,একি ভালোলাগা নাকি বন্ধুত্ব। কোনটা সবচেয়ে উর্দ্ধে জানিনা, সুরভীর সাথে আমার সম্পর্ক ঠিক সেইটাই। এ আমার ব্যাখ্যার অতীত। তাই হাসতে হাসতেই শহরে এলাম পড়তে, চিঠি লেখার প্রচলন চলে গেলেও আমি পছন্দ করি লিখতে, লিখে লিখে ড্রয়ারে ভরে রাখি, কথা হয় টেলিফোনে। মোবাইল কালচার আমার একটা মোবাইল পৌচ্ছালেও সুরভী মাত্র ইন্টামিডিয়েট পড়ে বলে তার হাতে দেওয়া হয়নি তখনও। আমার বুয়েটের শেষ পর্যায়ে সুরভী এলো ঢাকায়। ভর্তি হলো অংকে অনার্স নিয়ে। তেমনি আনন্দ আবার দোলা দিল আমার মনকে। সুযোগ পেলেই হোষ্টেল কিংবা লাইব্রেরীর সামনে যেতাম, দেখা হতো, হাঁটতে হাঁটতে ফুলার রোড শেষ করে কখনও কোন গাছের ছায়ায় বসতাম, কিংবা না বসে শুধুই হাঁটা হতো । আশ্চর্য হতাম ওর মধ্যে আমার ভালোলাগার নিরব প্রকাশ দেখে। গুনগুনিয়েগাইতাম, তোমার মধ্যে আমার প্রকাশ — ভাই এতো মধুর। সুরভী সুরেলা গলায় বলত, রবীন্দ্র সঙ্গীত ভুল করলে, ভুল বললে, আমার কষ্ট হয় বুঝেছ, ছায়ানট এতো কাছে, ভর্তি হয়ে যাও। বলতাম তুমি ভর্তি হয়েছে ওতেই হবে, আমি ভুল করব তুমি শুধরে দেবে। আমি মনের প্রকাশের জন্য গানের কলি ধরব, তুমি হৃদয় দিয়ে সে গানের মুর্ছনা আনবে। আমি বলতাম কতো কতো যে কথা। হোষ্টেলে ফিরে গিয়ে নিজে নিজেই গাইতাম 'আপনাকে যে জানা আমার ফুরাবে না' কি যেন কেন যে বারবারই গানটা গাইতাম। গানটা ঠিক না শুধু ওই একটা লাইন আর কি। বুয়েটের শেষ বছরটা বড় বেশী ব্যস্ত কেটেছে। এদিকে পরীক্ষার জন্য অসম্ভব ব্যস্ততা, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি, দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে লেখালেখি, কাগজ তৈরী, কানাডা, অষ্টেলিয়া, আমেরিকা সর্বত্রই কত যে ই—মেইল কত যে ফ্যাক্স পাঠানো, অস্ত ছিল না। সময় বয়ে যাচ্ছিল, খুব তাড়াতাড়ি বয়ে যাচ্ছিল দিনগুলো। আমার ক্ষেত্রে আমি আমাকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়েছিলাম, এতে সুরভীর প্রতি অবিচার হচ্ছিল কিনা ভাববার সময়টুকু পর্যন্ত মনে আসেনি। পরীক্ষা হয়ে গেল, ফলাফলের আগেই বাইরে যাবার কাগজ পত্রও প্রায় ঠিক ঠাক। আশ্চর্শজনকভাবে প্রথমবার দাঁড়িয়েই ভিসাও হয়ে গেল। প্রচন্ড গতির মধ্যে চলছি, কোনদিকে ফিরে তাকানোর সময় এতটুকু নেই। পরম সৌভাগ্য মনে করে গোছগাছ করছি, প্রচন্ড উত্তেজনা কাজ করছে ভিতরে বাহিরে । সুরভীকে নিভৃতে একাস্তে বলব বলে নিভৃত জায়গা খুঁজতে থাকলাম মনে মনে, ঢাকায় এমন জায়গা মনে আনতে পারছিলাম না কিছুতেই। শুধুই মনে হতে থাকলো সেই কৈশরে কাটানো গ্রামের নদীর ধার, বটের তল, কাশের বন নয়ত বাড়ীর সেই কাঠাল তলা। কাঠাল তলায় মনে হয় সবচেয়ে প্রথম খেলার বেলা কেটেছে ওর। কাঠাল গাছের ছালের তলা থেকে কমলা হলুদ রংয়ের গুড়ো দিয়ে রান্নাবাটি খেলা শেষ হলেও ওই গাছটি বোধহয় সুরভীর সবচেয়ে প্রিয়। হয়ত তার প্রিয় জায়গাগুলোর অন্যতম। শেষে স্থির করলাম, সবচেয়ে প্রিয় জনকে তার প্রিয় জায়গায় দাড়িয়েই আমার প্রিয় কথাটা বলব। কথাটা দশকান হওয়ার আগেই ওকে জানাতে চাই। ছুটলাম, বললাম, চলো একবার গ্রামে যাই একসাথে, দিন দুয়েকের মধ্যে সুরভী তাকালো, বিস্ময়ে দুই চোখে অসীম কৌতূহল, কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে সে তার চাঞ্চল্য প্রকাশ করল না। আমার অস্থিরতা অনুভব করল, কিন্তু নত মুখে বলল, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা আছে, এ মাসে সম্ভব হবে না। তোমার পরীক্ষা শেষ হয়েছে বরং তুমি ঘুরে আস। বললাম, একদিনের জন্যও কি হয় না ? পরদিন ফিরতাম একসাথে । সুরভী মুখ তুলল না, বুঝলাম সম্ভব না । এই প্রথম ধাক্কা খেলাম, নিশ্চয়ই বড় বেশী আব্দার করে ফেলেছি, বড় বেশী দাবী করে ফেলেছি, জানতে চাইনি ওর সুবিধা অসুবিধার কথা। আমার বলায় কি অনুরোধ ছিল নাকি নির্দেশের মত ছিল। যা হোক হলো না । প্রিয়জনকে প্রিয় কথাটা বলা হলো না মনমত করে । কি যেন কেন ক্ষোভে ফেটে পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমার ভীষণ রকম পরাজয় হলো, কিছুতেই এতো বড় পরাজয় মেনে নিতে পারলাম না। হঠাৎ করে কি যেন কি হয়ে গেল আমি সুরভীকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে ওর অনেক ক্লাসমেটের সামনে দুই বাহুতে বেধে ফেললাম, উম্ম চুম্বনে ভরিয়ে দিলাম, এক দুই তিনকরে বার বার, অনেবস্থার। অন্যেরা হয়ত অপলকে তাকিয়েছে, বিরক্ত হয়েছে, ক্ষুদ্ধ হয়েছে, ঘৃণার চোখে দেখেছে, কিন্তু তখন আমি কান্ডজ্ঞানহারা, বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত। কি করছি বা কি ঘটে যাচ্ছে মোটেই বুঝতে পারছি না। যখন ছাড়লাম সুরভীকে তখন ওর চোখ মুখের কি অবস্থা হয়েছিল দেখিনি, একদম ডাকাই নি, ছেড়ে দিয়ে কাঁধে একটা ঝাকুনি দিয়ে একেবারে হনহন করে চলে গেলাম । হলে গিয়ে দরজায় ছিটকানি দিলাম । মেয়েদের মতো একেবারে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম । যেমন দ্রুত উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম, তেমনি অভ্যস্ত ধীর গতিতে প্রশমিত হলাম, আর তখন ধিক্কারে ধিক্কারে নিজেকে জর্জরিত করতে থাকলাম। কি করেছি যখন বুঝতে পারলাম, কেন করেছি তার কোন ক্ষমা খুঁজে পেলাম না । মুখ দেখাতেও লজ্জা, নিজের প্রতি ঘৃনায় কুঁচকে যাচ্ছি, এ কি করলাম। সে কি আমি ছিলাম ? সে আমি কোন আমি। যন্ত্রণার নানা রকমের আঘাত আমাকে জর্জরিত করল, আমি বেশ কয়েকদিন উদভ্রান্তের মত কাটালাম, সুরভী কোন খোঁজ নিতে এলো না। এতে আমার যন্ত্রনা ধীরে ধীরে অন্যখাতে বইতে শুরু করল। ক্ষোভ পরিনত হলো অভিমানে, রাগ পরিনত হ'ল বিরক্তিতে, হৃদয়ের ক্ষরণ পরিণত হল অবহেলা ও অবজ্ঞায়। এ সবই হচ্ছিল আমার মানসিক বিকার থেকে, বুঝতে পারছিলাম কিন্তু প্রতিহত করতে পারছিলাম না। কেন যে পাশবিক বৃত্তি আমাকে চেপে ধরেছিল বুঝতে চেষ্টা করেও তাকে জয় করতে না পেরে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে শেষে বিদেশে চলে আসাটা এগিয়ে দিলাম, একেবারে মাস খানেকের মধ্যে। মাস দুয়েক গেলো ধাতস্ত হতে। নিজে হাতে রান্না শিখলাম, ঘর, বাথরুম পরিস্কার করি, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুয়ে এনে টানটান করে নেই, কখনও ইস্ত্রি করি, সবই পারি, পারতে হচ্ছে। শুধু বোতাম খুলে থাকলে কান্না পেতে থাকে। মা'র কথা মনে হয়ে যায়। মার কথা মনে হলেই ওই গ্রামের বাড়ী, আর গ্রামের বাড়ীর সাথেই রয়েছে আমার সকল সুরভী। সুরভীকে ভোলা যায় না, ভুলতে পারছিও না, নিজেকে দংশন করে ক্ষত বিক্ষত করেও কোন বিশ্লেষণ খুঁজে পাচ্ছি না। কেন ওর সাথে দেখা না করে, কোন কথা না বলে অমন ব্যবহার করে চলে এলাম। এলাম তো এলাম একেবারে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়। কোন মেয়ের সঙ্গেই কোন সম্পর্ক গড়ে উঠছে না, অন্যরা আড়ালে বেরসিক বলে, অহং আছে তাও ভাবছে হয়ত, কারণ এ বয়সে খুব কম জনই একা আছে। কেউ দেশে গিয়ে বিয়ে করে আসছে কেউ এখানেই জুটি বাঁধছে, আমার মত ভাগ্যাহত কমই আছে। কেন যেন কদিন ধরে নিজেকে ভাগ্যাহত মনে হচ্ছে, পরাজিত মনে হচ্ছে। কিন্তু সুরভীকে নিয়ে কখনও কি অন্যরকম ভেবেছিলাম, মনে পড়ছে না, শুধু শেষ দিনের ওই উত্তেজনাটুকু ছাড়া কখনই অসংলগ্ন হইনি। আমার রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনা হারিয়ে গেছে সেদিন। হারিয়ে গেছে আনন্দধারা। আমি ফিরে ফিরে আসতে থাকি ভাসতে থাকি সেই কৈশরে সেই যৌবনে। সুরভী কোথায় ছিল সে স্থান যেমন বের করতে পারিনি তখন, এখনও পারছি না ও আমার ঠিক কতটুকু। সেদিন রাতে হঠাৎ মনে হলো, ওর প্রতি বড় অন্যায় করে ফেলেছি। কোনদিনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি সে আমাকে কিভাবে দেখতো, কিভাবে পেতে চেয়েছিল। নিজেকে প্রশ্ন করেছি কিন্তু ওকে কোনদিনও প্রশ্ন করা হয়নি। ওর হয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হলো ওকে আমি বড় বেশি নিপিড়িত করেছি, লাঞ্ছিত করেছি। ওর স্বাভাবিক চলার পথে শুধু বাঁধা হয়েই দাড়িয়েছি এতোটুকু সহযোগীতার হাত বাড়াইনি। ওকে ওর মতো থাকতে দেইনি, নিজের ভাবনাগুলো, ভালোলাগা, মন্দলাগা এর উপরে চাপিয়ে দিয়েছি। ভেবে ভেবে মনে আনতে চেষ্টা করি ওর কোন রকমের ইঙ্গিত কি আমি পেয়েছিলাম, কোন কথা
কিংবা কোন ব্যবহারে । আসলে আমি ওভাবে কখনও ভেবেই দেখিনি। ওর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অংকে ভর্তি হতে পারাটা ছিল আমার জন্য বিস্ময়। আমি ওর প্রতিভা সম্বন্ধে তাহলে কি খুব কম মূল্যায়ন করেছিলাম ? নইলে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম কেন? ও মূর্খ নিচু করেছিল, ওটা ছিল ওর বিনয়, ওর স্বভাব সুলভ ভদ্রতা। নাকি ও অংকে ভালো জানতো বলে জীবনের যোগ বিয়োগেও আগে থেকেই করে রেখেছিল।। জীবনকে সরল অংকের সমাধানে নিয়ে এসেছিল। কোনদিন ভাবিনি,ও আমাকে কতটুকু ভেবেছ ভাবনার ওজন নিজেরটাই নিজে মাপিনি তো ওরটা মাপবো কিভাবে। এ কিন্তু এখন বড় বেশী কঠিন মনে হচ্ছে, এ ব্যাথাভার আমার কোনদিন নামবে না । সুরভী, তোমার কাছে ক্ষমা চাইব সে মুখও তো আমার নেই। রুম মেট রকিবের ই—মেইল পাওয়ার পর থেকে শুধু সেই কথাই ভাবছি, আমি কি তোমার সহজ চলার পথটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, তোমার বন্ধু গড়ে তুলবার পথ, প্রেমের পথ, ভালোবাসার পথ, সংসার বাঁধার পথ। আমি কি এতোটাই অপরাধী আজ তোমার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা, তুমি আমাকে ঘৃণা কোরা, চরম ঘৃণা। ঘৃণা যদি কখনও ভালোবাসায় রুপান্তরিত হয় । আজকে আমি একটা — ই মেইল করব, না থাক ি চিঠি লিখে ড্রয়ার ভরাব ।