খুঁজে ফিরি

খুঁজে ফিরি,

 খুঁজে ফিরি

মোঃ আমিনুল হক এম.পি
ব্যারিষ্টার এট—ল
মন্ত্রী—ডাক,তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়
গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।


কলম ধরেছি স্মৃতি কথা লিখব বল। অথচ বিগম সময়ের রোমন্থন, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা কত নতুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা সাগরের ঢেউয়ের মত একের মাঝে অন্যটা এসে মিলে মিশে যাচ্ছে, কোনটা ছাড়ব আর কোনটা গুনব বুঝে উঠা ভার। জীবনের স্তরে পলিমাটির মত কত সঞ্চিত ধন, কত সুন্দর সকাল, মরুভূমির বুকে শুকিয়ে সন্ধ্যা, জাহাজের "ভোঁ' নিয়ে যেত কত কত দূর, সাত সমুদ্র তের নদীর পাড়। কত ছোট দুঃখ মনে হত দূর গগনে নক্ষত্রের কাছে গিয়ে পৌঁচ্ছেছে। কত না মায়াজাল মহাবিশ্বের নীহারিকার মতো কোটি কোটি আলোক বর্ষের উপরে উঠে গেছে। যত যাই আসুক আর যাক আমার স্কুলজীবনে কাটানো সময়টুকুর তুলনা নেই আমার কাছে। সবচেয়ে মধুর স্মৃতিতে ভরা, কোমল মতির শিশুকাল কৈশোর কাটানো সময়গুলো। প্রত্যেকের মত আমারও মনে হয় আর একবার ফিরে পাই সে জীবন । ১৯৪৭ সালে বাপুর হাত ধরে স্কুলে প্রথম গিয়েছিলাম নাকি বড়ভায়ের সাথে, নাকি দল বেঁধে বন্ধুর সাথে আজ আর মনে পড়ে না, তবে বাড়ী ফিরে এসে আলাদা রকমের অনুভব হয়েছিল মনে হল যেন একটা . আলাদা আইডেনটিটি পেয়েছি। অনেক ভাই বোনের মধ্যে আলাদা মূল্যায়ন হোক বা না হোক স্কুলের ছাত্র হওয়ায় নিজের মধ্যেই গর্ববোধ করছিলাম। নতুন বইয়ে মলাট দেওয়ার সে যে কি উম্মাদনা! তবে বলতে মোটেই দ্বিধা নেই যে বাপু পুরানো বই সংগ্রহ করে এনেছিলেন, আর রাফ কাজ করার জন্য এক পৃষ্ঠায় লেখা কাগজ দিয়ে খাতা । কিন্তু তাতে কিছু মনে হয়নি তখন, স্কুলের কোন ক্লাসে নতুন কোন বই পেলেও পেয়ে থাকতে পারি, কিন্তু ওই পুরানো বইটা হাতে এলেই নিজের বলে অনেক যত্নে রাখতাম। প্রথম বছরের স্মরনীয় ঘটনা এখন যেমন হাসায়,অন্যের কাছে নির্বোধ বানায় কিন্তু আমার কাছে সেটাই সত্য মনে হয়েছিল। ভর্তি হওয়ার কয়মাস পরেই পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। পরীক্ষা শেষ করে অত্যন্ত আনন্দনিয়ে বাড়ী ফিরলাম। কারণ প্রশ্নের সব কিছু লেখেছি। দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন কিছুই বাদ দেই নি। মা তো কাজে অনেক ব্যস্ত, একবার শুধু বললেন কেমন হয়েছে, বললাম ভাল, খুব ভাল। বাপু বিকেলে ফিরে এসে বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করছেন, সব লিখেছি কিনা। বলেছি, জি বাপু সব লিখেছি। আসলে সব বলতে কিন্তু কিছুই বুঝিনি। কোন প্রশ্নেরই উত্তরের দিকে যাইনি, সবটুকু প্রশ্ন হুবহু খাতায় তুলে দিয়ে এসেছি। ভেবেছি সব লেখা মানে এটাই সবটুকু তুলে দেওয়া। ইয়াসীন স্যার, গফুর স্যার, নুরমহম্মদ স্যার প্রাইমারীতে। এই সব স্যারের নাম মনে পড়ে। স্যারদের তত্ত্বাবধানে বা অভিভাবকত্বে আমাদের বিপথে যাবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। প্রতিটি শিক্ষক ছিলেন আদর্শবান। আমি ছোট থেকেই তাঁদের কাছে সৎপথে চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। উনাদের মধ্যে আমি দেখেছি শিক্ষায়, সাহিত্যে, জ্ঞানেবিজ্ঞানে অনেক বড় মাপের। তাঁদের জ্ঞানদানকে মনে হতো তাঁরা সমাজের সেবক। ক্লাসে মনযোগী আর কোনদিন অনুপস্থিত না থাকা এটা আমার বৈশিষ্ট্য ছিল কিন্তু টিফিনের সময় কিংবা ছুটির পর মাঠ সরগরম করতে জুড়ি ছিল না। বড় ভাই স্কুল ছুটির সাথে সাথে বাসায় ফিরলেও আমি বেলা ডোবার আগে ফিরেছি বলে মনে পড়ছে না। এজন্য যে বাড়ীতে উত্তম মধ্যম খেতে হয়নি তাও না, কিন্তু পরদিন সব ভূলে গিয়ে আবার একই কাজ করেছি। বাড়ীর অবস্থা এতো স্বচ্ছল ছিল না যে অনেক কাজের লোক সবকাজ করে দেবে। তাই বাড়ীর ছাগল গুলোকে বাড়ীতে ফিরিয়ে (মাঠথেকে) আনা ছিল আমার দায়িত্ব। কিন্তু ছাগলের প্রকৃতি যে আমার চেয়েও দুরন্ত ও চতুর তা আমার জানা ছিল না। ওরা সাধারণতঃ পালাতো বেত ঝাড় বা বেত বনের ভিতর তখন সমস্ত হাটপাড়াটাই ছিল বেতের জঙ্গল, আর অন্যান্য অনেক লতাপাতা ঝোপঝাড়ে ভরা। গা ছম ছম করা আলো অন্ধকার আর ভৌতিক পরিবেশ। ওই জায়গায় দিনেই ভয় লাগত আর সন্ধ্যায় সে যে কি অবস্থা! কত যে দোয়া পড়ে নিজের বুকেই নিজে ফুঁ দিতাম, থুতু ছিটাতাম তার শেষ নাই। এরপরেও ছাগলগুলো সহজে পেয়ে গেলে কোন কথা ছিল না। কোন কোন ঘাপলা হতেই হতো। একটা ধরিতো অন্যটা পালায, মোটেই ফিরতে চায় না, তাছাড়া অন্যের শক্তির বাগান বা ক্ষেত নষ্ট করায় প্রায়ই ধরে নিয়ে তারা খোঁয়াড়ে দিত। জানতাম এই ছাগল ছাড়াতে মার কাছে পয়সা পাব না বরং বেত পড়বে পিঠে, কতদিন যে কাকুতি মিনতি করে ছাড়িয়েছি। মায়ের কড়া শাসন, বাপুর নিরব নিষ্ঠা আর বড়ভাইয়ের স্নেহে শিশুকাল গড়িয়ে কৈশোরে এলাম । মাইনর স্কুলে পড়ি বলতেই কলার ঝাঁকানোর মত অবস্থা। মনে হয় জুনিয়রদের উপদেশ দিতাম। মুখস্ত রচনা থেকে ছাত্রদেরকে ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি সেটা বলতাম। বলতে ভালবাসতাম তাই দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ক্লাস মেটদের নিয়ে অনেক কথা বলতাম। ক্লাসমেটদের মধ্যে ছিল মিন্টু,আলফাজ, মুস্তাকিম এদেরকে আমি সবসময়ই কাছে পেতাম। আমার অবাক লাগতো যখন দেখতাম আমার কথা ওরা মন দিয়ে শুনতো। আর এতে আমার বলার আগ্রহ আরও বেড়ে যেত । আমরা সবাই মিলে আনেক পরিকল্পনা করতাম। খেলার মাঠ ছিল সর্বাধিক প্রিয়। প্রথমে গাছের জাম্বুরা দিয়ে তারপর চাঁদাতুলে ফুটবল কেনা হলো। বল খেলায় সে যে কি আগ্রহ। বাড়ীতে ফিরে যেতে মনই চায় না এমনই খেলার নেশা। বলকে নিজের জামা দিয়ে মুছে রাখতাম আমরা, এতোটাই যত্নে রাখতাম। তখন মনে হতো আমি একজন বড় ফুটবল প্লেয়ার হব। ঠিক ‘পেলের কিংবা 'ম্যারাডোনার' মত। আমি আশে পাশের গ্রামে যেমন রাজারামপুর, মহিষালবাড়ী, পিরিজপুর, বাসুদেবপুর, বালিয়াঘাটা, মাটীকাটা, আলতুলির চরে ফুটবল খেলতে' হায়ার হয়ে যেতাম। বেশীর ভাগ সময়ই গলায় মালা ঝুলিয়ে টিমকে জিতিয়ে আসতাম। একবার তো নিজেদের গোদাগাড়ীকে জিতিয়ে নেব বলে রাজশাহী থেকে পুরো টিম হায়ার করে এনেছিলাম। এমনই নেশা ছিল। এ ব্যাপারে বাড়ী থেকে তেমন উৎসাহ দেওয়া হয়নি। খেলতাম ওই পর্যন্তই কিন্তু এর জন্য লেখাপড়ায় কোন ছাড় পাবার উপায় ছিল না। প্রতিদিনের অংক, ইংরেজি ঠিকই করতে হতো। বার বার ক্লাস ক্যাপটেন হতাম বলে পড়াশুনায় ভালো থাকতেই হতো। কিন্তু ক্লাস ক্যাপটেনই ক্লাসে বেশী গন্ডোগোল করছে বলে স্যারদের কাছ থেকে পিঠে কম বেত পড়েনি । নিত্য নতুন আইডিয়ার তো অভাব ছিল না। একবার নেশা উঠল স্কুলের ছাত্ররা মিলে একটা ক্লাব গড়ে তুলতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ, সবাই মেতে উঠলাম। কোথায় কার কাছে একটা ঘর পাওয়া যাবে, ঘর পেলে তারপর যোগাড় করা হবে টেবিল চেয়ার, বইয়ের আলমারী, রাখা হবে খবরের কাগজ। তখন মনে হতো এমন মহত উদ্দেশ্যের কথা আগে কেন কেই মনে করেনি। ছাত্ররা অবসর সময়ে একসাথে বসবে, আলাপ আলোচনা করবে, যে যে বিষয়ে বেশী জানে অন্যকে সেটা শিখাবে, দেশ বিদেশের ভাল ভাল গল্পের বই থাকবে, ছাত্ররা খাতায় সই করে বই নেবে,পড়া হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে যাবে। গোদাগাড়ীর বুকে এর চেয়ে মহত কাজ বুঝি আর নেই। এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল স্কুলের শিক্ষকদের মাধ্যমেই। ইউনিয়ন বোর্ডের এক ঘর পাওয়া গেল। সাথে ছিল ক্লাস মেট, ছোট ও বড় ক্লাসের ছাত্ররা। আরেকটা স্মৃতি খুব বেশী সমুজ্জল। তখন মনে হয়েছিল কেন আরও কয়েক ক্লাস উপরে পড়লাম না। মনে হয় তখন মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ি। ভাষা আন্দোলনের জোয়ার তখন দেশ ব্যাপী। কোন রকম রেডিও বা টেলিভিশন কথন ছিল না, শুধু খবরের কাগজ, তাও আসত বাসি হয়ে অর্থাৎ পরের দিন। তবুও ভাষা আন্দোলন এতোটাই প্রভাব ফেলেছিল যে কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের কানে চলে এসেছিল। বড় ক্লাসের ছেলেদের দেখা দেখি আমি ছোট ক্লাসের ছেলেদের নিয়ে একটা মিছিল বের করেছিলাম। বড় ক্লাসের ছেলেরা যে সব শ্লোগান দিতে দিতে গেল ঠিক সেই সব স্লোগান দিতে দিতে আমরাও স্কুল ছেড়ে গ্রামের দিকে না যেয়ে থানার পাশ দিয়ে হাটপাড়ার দিকে যাচ্ছিলাম। মনে আছে পুলিশ প্রথমে আমাদের মিছিল দেখে হেসেছিল, তারপর থামতে বলেছিল। কিন্তু ওদের হাসি দেখে আমাদের জেদ চেপে গিয়েছিল, আমি আরও জোরে শ্লোগান দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। থানায় আটক হয়েছিলাম। আমার সাথে আরও কয়েকজন, মিন্টু, আলফাজ, মুস্তাকিম। আমার খারাপ লাগছিল বাড়ীর কথা ভেবে। মা এখন কাঁদবেন, কিন্তু বাড়ীতে পৌছান মাত্র পিঠের চামড়া তুলবেন। আর বাপুকে আমার জন্য ছোট হতে হবে। তবে এতো কিছুর পরেও নেতা হওয়ার আনন্দ বুকের ভিতর ভালই আলোড়ন তুলেছিল। আরও একটা ব্যাপারে আমার আগ্রহের অন্ত ছিল না সেটা হচ্ছে স্কুলে বছরে একবার নাটকের আয়োজন করা। এতো বেশী আগ্রহ ছিল যে মঞ্চস্থ হওয়ার প্রায় মাস দুয়েক আগে থেকে শুরু করতাম নাটক বাছাই, বাছাই করে সিদ্ধান্তে এসে গেলে শুরু হতো চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেদের বাছাই পর্ব। বেশ কিছু অতিরিক্ত বাছাই করা হতো প্রতিটা চরিত্রের জন্য। একজন না পারলে যেন আরেকজনকে টেষ্ট নিতে পারি। এতো কঠিন আর কাঠোর ভাবে তাদের রিহার্সালে উত্তির্ন হতে হতো যে কি বলব। নিজেকে মনে করতাম পাকা ডিরেক্টর, আমি যেমন করে দেখাতাম, মনে করতাম ওটাই শ্রেষ্ঠ নির্দেশনা, সাথে থাকতো, মিন্টু, আমার মামা রফিক অভিনয় করতেন। মঞ্চস্ত হওয়ার দিন যতই এগিয়ে আসত ব্যস্ততা ততই বাড়ত। রাত জেগে রিহার্সাল করানো, ভালো ভাবে প্রম্পট্ করতে শেখানো সব দিক দেখার দায়িত্ব যেন আমারই ছিল। এরপর দাওয়াত কার্ড তৈরী করা, মঞ্চ তৈরী করা, তার জন্য কাপড়, চাদর জোগাড় করা, তখনতো আর ডেকোরেটর ছিল না। স্কুলের মাঠের মধ্যে বেশ উঁচু করে মাচান বেঁধে মঞ্চ করা হতো । এরপর হ্যাচাক আলোর ব্যবস্থা। শেষ কয়দিন খাওয়া খুম সব প্রায় ভূলে যেতাম। বাড়ীতে বকুনি ছিল ঠিকই কিন্তু বছরে একবার নাটক দেখার আগ্রহ তাদেরও কম ছিল না। পাড়া প্রতিবেশীরা বলত, টিকিটের দাম যেন কম রাখা হয়। কেউ কেউ বলত বিনা টিকিটের করলেই পার, বিজ্ঞের মত বলতাম তা কি করে হবে, এতো এতো খরচ আছে না। রিহার্সালের সময় চা নাস্তা খাওয়া, কার্ড ছাপানো, বাঁশ কাঠের খরচ, মাচাবাঁধানোর দাম, হ্যাচাকের ভাড়া, আর রাজশাহী থেকে যে নায়িকা আনা হবে, নায়িকার সাথে সঙ্গী আসত কমপক্ষে পাঁচজন, তবলা বাজানোর তবলচি। আমি কোন দিন অভিনয় করিনি, সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকতাম সে ক্ষেত্রে বলা চলে শিক্ষকের ভূমিকা। তবে বন্ধু মিন্টু সব সময়ই নায়ক হতো। আর নায়িকা আনতে হতো রাজশাহী থেকে। নায়িকার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হতো সাধারণত হারু বাবুর বাসায়, তাদের অযত্ন হয়নি কখনও। স্কুলের মাঠ ভরে গিয়ে উপচিয়ে উঠত। শেষের দিকে বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে এমন কি গাছের উপর পর্যন্ত থিয়েটার দেখতো। নাটক শেষ হয়ে গেলে পরদিন স্কুলর মাঠটা দেখে মনটা খারাপ হয়ে যেত। লাল নীল ছেঁড়া কাগজের টুকরা, বাদামের খোলা, দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা বাঁশ কাঠ আমাকে কাঁদাতো। কিন্তু বেশীদিন চুপচাপ থাকতে পারতাম না, আবার কোন নতুন নেশায় মেতে উঠতাম । মনে আছে স্কুলের ফান্ডের জন্য চাঁদা তুলেছিলাম । টিনের কৌটা হাতে প্রত্যেকটা বাড়ীতে গিয়েছিলাম, এক আনা দুই আনা সিকি আধুলী যে যা দিয়েছে নিয়েছি। তারপর স্কুলের নির্দিষ্ট স্যারের হাতে তুলে দিয়েছি। একবার ভিষন রকম একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। তখন আমরা এপ্রিলফুল করতে পারলে খুব মজা পেতাম। সকাল থেকেই সারাদিন ধরে যে যাকে পারি আর কি তারপর স্কুলে স্যারদের। নতুন এসেছেন রহিম খন্দকার স্যার। তিনি অত্যন্ত নরম সরম আর অমায়িক ছিলেন। টিফিন পিরিয়ডের পরেই তাঁর ক্লাস। আমরা দরজা বন্দ করে দিয়ে দরজার, একদম মুখে একটা বড় সড় গর্ত করে উপরে পাতিলা চাটাই দিয়ে ঢেকে আবার ঠিক আগের মত করে রাখলাম। বলাই বাহুল্য উদ্যোগ আমারই ছিল। ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে আমরা সুবোধ বালকের মত যে যার বেঞ্চে বসা। স্যার আসছেন বুঝতে পারছি, আমরা সব চুপ হয়ে বসে, দরজার ভিতরে পা রাখতেই স্যারের পা গর্তে পড়ল, স্যার পড়ে গেলেন। সবাই হেসে উঠলাম। এটা যে কতখানি হঠকারিতা বা নিষ্টুরতা করেছিলাম তখন বুঝিনি । স্যার যা হোক উঠে এসে চেয়ারে বসেই বললেন কাজ কে করেছে? আমি জানি এটা নিশ্চয়ই নান্টুর কাজ।” আমি জানি এর শাস্তি কত কঠিন হতে পারে। হেড মাষ্টারের কানে তো যাবেই, আর তিনি এসে কতগুলো বেত মারবেন, হাতে মারবেন নাকি পিঠে তা তিনিই জানেন। আমি তাড়াতাড়ি করে উঠে বলতে গেলে চোখের পলকে ক্লাস রুম থেকে জানালা দিয়ে দিলাম লাফ। আর লাফ দিয়েই একেবারে ভোঁ দৌড়। পিছনে আরও দুজনের পায়ের শব্দ শুনলাম, ভাবছিলাম বুঝি ধরতে আসছে, কিন্তু না ওরাও আমার মতই ভয় পেয়েছে কারণ সহযোগীতা তো করেছিল। তখনকার মতো বেত খাওয়া প্রচণ্ড থেকে বাঁচলেও বাড়ীতে বাপুর হাতে মার খেতে হয়েছিল । " স্কুলের প্রতিটা দিন যেন আমার কাছে নতুন উদ্যম নিয়ে আসত। সারা মাঠে আউটডোর খেলাতো ছিলই কিন্তু ইনডোরে ক্যারম, লুডু, তার কমপিটিশনও কম ছিল না। শীতের আগে দিয়ে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা হতো, চাঁদা তুলে, চেয়ে চিন্তে নেট, কর্ক আর ব্যাট কেনা হতো। গোদাগাড়ী থানার দারোগার মেয়ে আমার ক্লাস মেট ছিল । নাম রাণী। সেও খুবই দুরন্ত আর মেধাবী ছিল। খেলতোও ভালো। ওদের বাসার সামনে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা হতো, অবসরের সময় খেলতো বলে ওর হাত পাকা ছিল। আমি বিনা প্যাঁকটিসে ভাল খেলতাম, ভালো ফলাফল করতাম বলে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দিতা চলত। স্কুলে ফুটবল বা যে কোন খেলায় সে অন্যদলকে সমর্থন করতো। একে তো মেয়ে তার উপর দারোগার, মাষ্টার থেকে ছাত্ররা সবাই সমীহ করতো, এতে আমার বড় বেশী গা জ্বালা করতো । সারাদিন দস্যিপনায় মেতে থাকতাম বলে আমাদের যে শিষ্টাচার বা শ্রদ্ধাবোধ কম ছিল তা কিন্তু না। আমরা স্যারদের দেখলে বড়দের দেখলে সালাম দিতাম, হাট, বাজার, মাঠে, পথে দেখা হলে কুশল জিজ্ঞাসা করতাম, এগুলো আমার স্কুল শিক্ষকদের কাছেই শেখা। বাড়ীতে মা মারতেন, বাপু শার্ষন করতেন, আর বড় ভাই আমাদেরকে কোনদিন একটা কানমোচড়ও দেয়নি। আমার পরের ভাই রেজাউল (ভালো) গেল রাজারামপুর খামার স্কুলে। কেন গেল জানি না, কারণ আমাদের স্কুলের চেয়ে সুন্দর স্কুল আর কোথাও থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। তবে ও যাওয়াতে সুবিধা হলো যে আমার উপর খবরদারী করার কেউ থাকলো না, রবুতো বেশ ছোট (রবু হচ্ছে আসাদ), সেও ফুটবল খেলতে চাইতো কিন্তু ওদের ব্যাপারে কড়া শাসক, বলতাম পড়া ছেড়ে খেলতে হবে না, যা ট্রান্সস্লেশন কর গিয়ে বাড়ীতে ফিরে গেলে দেখব। বাপুতো পড়াতেনই, কিন্তু ছোটভাই বোনের পড়া দেখানোও আমাদের কাজ ছিল। বাইরে বেশী ঘুরি বলে বাড়ীর কাজ কম করা হতো আর তাই এই পড়ানোর দায়িত্বটা আপনা থেকেই নিতাম। এতে একটু মাষ্টারী ভাব আছে, ছোটদের মারা যায়। ওরা আমাকে এজন্য ভয় করত কিনা জানিনা তবে বড়দা মানে এনামুল হক কে আমরা সবাই কেন যেন ভয় করতাম, কোন দিন তারউপর দিয়ে কোন কথা কেউ বলিনি। মনে হয় এটা মায়ের শিক্ষা। মা তাড়াতাড়ি করে গরম ভাত, ভাজি, ডাল, পাটি পেতে এগিয়ে দিতেন, বাপুর সাথে আমরাও তাই খেয়ে স্কুলে যেতাম। অন্যভাইরা পকেটে মুড়ি নিত টিফিন খাবে বলে, আমি কখনও ওসব নেইনি, কারণ আমার খাবার সময় কোথায়, খেলব, দলগড়ব, নতুন ফন্দি আটব নাকি খাব। আমাদের জন্য দুইটা করেই সার্ট ছিল, বর্ষাকালে ভিজা সার্ট গায়েই শুকাতো। তখন সবার পায়ে পায়ে এতো জুতা সেন্ডেল ছিল না। আমরা স্কুলে পায়ে দেওয়ার জন্য আলাদা জুতা পেতাম না তবে প্রত্যেক ঈদে নতুন জুতা পেয়েছি মনে আছে। নতুন জুতা পায়ে দিয়ে সুলতানগঞ্জের মেলায় হেঁটে হেঁটে ঘুরে ঘুরে পায়ে কত ফোস্কা তুলে ফেলেছি। স্কুলের বন্ধুদের সাথে মেলায় বেড়ানোর মজাই আলাদা। কত যে পাঁপড় ভাজা, বারোভাজা আর হাওয়াই মিঠাই খেয়েছি। সবই বন্ধুদের ঘাড় ভেঙ্গে। বাড়ী থেকে বাপু একদিন সবভাইদের ও একমাত্র বোন নিয়ে মেলায় যেতেন, সেদিন সবাইকে পেটপুরে মিষ্টি খাওয়াতেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডাটাই বেশী আকর্ষনীয়, মনে হতো এতো বড় আনন্দমেলা আর কোন মেলাতেই বুঝি নেই । মাঝখানে আরেকটা নেশায় পেয়ে বসেছিল। খুব বেশী ধার্মিক হয়ে উঠেছিলাম। গোড়ালীর গিটের উপর পায়জামা পরতাম, মসজিদে গিয়ে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়াতাম। মাঝে মাঝে আযানও দিতাম । কেউ কেউ ঠট্টা করত, বলতো এতো ছোটতে শুরু করেছে এটা থাকবে না। দেখা যাবে দরকারের সময় মোটেই নামাজ পড়বে না। আমাদের স্কুলে ইসলামিয়াতে স্যার ছিলেন মহসীন মৌলভী । মনে হয় তিনিই প্রভাবিত করেছিলেন কিংবা বাজান (অর্থাৎ চাচা), হজ্জ্ব করে এসেও দাদৌ বলে থাকতে পারেন। আসলে যখন যেটার নেশা চাপতো। আমি এমনই দুরন্ত ছিলাম তাই নিজের কথা নিজে লিখতে লজ্জাও পাচ্ছি। আবার ভাবতে অবাকও হচ্ছি। নিশ্চয়ই সবার মাধ্যেই অনেক সমুজ্জ্বল স্মৃতি থাকে । এখানে প্রসঙ্গক্রমে মোল্লা এবাদত হোসেন স্যারের লেখা বই “আপনার চেয়ে আপন যে জন' ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি “আগেই উল্লেখ করেছি আমিনুল হক (নান্টু) এনামুল হকের ছোট ভাই । এনামুল আমার জন্য যখন যা দরকার করেছে কাজেই নান্টু বিশেষ কিছু করার সুযোগ পায়নি । আসলে সে নীচের ক্লাসে পড়তো বয়সও খুব অল্প ছিল। তার পিতা আমার সহকর্মী ছিলেন বলেই তাদের সঙ্গে আমার পরিচয়টা বেশী ছিল। ভাষা আন্দোলনের সময় নান্টু বোধ হয় পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিল । সেই সময় ছোট ছেলেদের নিয়ে এক মিছিল বের করে এবং থানায় তাদের আটক করে। জয়নাল পন্ডিত সাহেব তো তার পিতা ফহিমউদ্দিন মাষ্টার সাহেবকে খুব একচোট ঠাট্টা করলেন ছেলে নেতা হয়েছে বলে । পরবর্তীকালে সে নেতৃত্বের গৌরব রক্ষা করেছে। গোদাগাড়ী স্কুল থেকে পাশ করে নান্টু রাজশাহী সরকারী কলেজে অধ্যয়ন করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম, এ, পাশ করে ব্যারিষ্টারী পড়ার জন্য লন্ডন গমন করে এবং বার, এট,ল ডিগ্রি লাভ করে হাইকোর্টে ব্যারিষ্টারী শুরু করে। বর্তমানে সে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী জানিনা সেদিনের ওই আমির মধ্যে এদিনের আমিকে খুঁজে পাবেন কি না !!

Read Also :-
Labels : #খুঁজে ফিরি ,
Getting Info...

Post a Comment