পুলিশ গল্প
পথের শেষ কোথায়
প্রফেসর অনামিকা হক লিলি

তুমি এতো সন্ধেহ প্রবণ তা আমার যানা ছিল না, ছিঃ, ভাবতেও অবাক লাগে, মনটা এতো ছোট হয় কিভাবে। আমার মন ছোট ? আমি সন্ধেহ প্রবণ ? কিন্তু কেন এটা হয় বা হচ্ছে, বলতে পার ? তোমার পূর্বের কৃতকর্মই আমাকে এমন করাচ্ছে বুঝেছ ? ওদের দুজনের এ এক নিত্য সমস্যা, নিত্য বিবাদ, নিত্য কলহ। মাঝে মাঝে এতটাই দুঃসহ হয়ে উঠে যে, তখন আজিম নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। আজিমের ইচ্ছে করে না ওদের বাবা কিংবা ছোট মা ডাকতে। বাবার আদর্শ যদি বাবার মধ্যে না পাওয়া যায়, বাবার শ্রদ্ধা যদি বাবা রাখতে না পারে, বাবার সম্মান যদি বাবা নিজেই রাখতে পা চায় তাহলে আজিমের কি করার আছে। আজিম বইয়ের মধ্যে মুখ গুজে থাকে, লেখাপড়ায় মনোযোগী হয় যতটা তার সম্ভব । মা গ্রামে, আজিম প্রতি সপ্তাহে একটা করে তাকে চিঠি লেখে। একই রকম কথা সারাবছর লেখে। আমি ভালো আছি, লেখাপড়া করছি, তুমি ভালো থেকো, আমার জন্য দোয়া করবে, তোমার কষ্ট নিশ্চয়ই একদিন দূর হবে। সামনেই পরীক্ষা। এখানে সবাই ভালো আছে। আজিমের ইচ্ছে করে গ্রামে মার কাছে থাকতে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে অনেক বেশী ম্যাচিওর করে গড়েছে। সে জানে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, যাকে বলে মানুষ হওয়া তাই হতে হবে। চোখ কান বুজে তাই সে এখানে আছে। হোষ্টেলে থাকার টাকা পেলে সে সেখানেই যেতো। এখানে থেকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে এতেই সে সন্তুষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে ভর্তি হতে পারলে যে করেই হোক হোষ্টেলে থাকবে সে। ছোট মা সম্বন্ধের ওই মহিলাটিও কম ধুরন্ধর না। নিজের প্রয়োজন ঠিক ঠিক বুঝেছে। একটা মেয়ে আট বছরের, নাম রেখেছে 'রুক্মি'। তার দেখা আর জানার মধ্যে রুক্মির মতো আশান্ত মেয়ে দুটো নেই। যা হোক ওই রুক্মির জন্যই তার এখানে স্থান অথ্যাৎ অবস্থান হয়েছে। দুবেলা খাওয়া আর লেখাপড়ার খরচের ব্যবস্থা। ওটাকে দুঘন্টা পড়ানোর চেষ্টা করা মানে নিজের চারঘন্টা পড়ার ক্ষতি। তবু বেয়াদবী চঞ্চলতা অস্থিরতা সহ্য করার পর ঘন্টাখানেক লাগে ধাতস্থ হতে, আর ওকে নিয়ে বসতে হবে একথা ভেবে ঘন্টা খানেক আগে থেকেই গায়ে জ্বর আসে। তবুও তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যতই দোজখ বা নরকের অনুগুনের আঁচ লাগুক না কেন, নিজেকে তৈরী করে নেবার, নিজেকে ধৈর্যশীল করে গড়ে তুলতে, নির্ঝঞ্জাট হয়ে এককোনে পড়ে থাকতে, অন্যের বিরক্তির উদ্রেক না করতে শেখা, অযথা কথা না বলা বা যে কোন বাহুল্যতা বর্জন করতে পারা, মাঝে মাঝে নিজের ক্ষুধা তৃষ্ণার কথাও ভুলে থাকতে পারা, এসব কি কম শেখা হচ্ছে আজিমের ? জীবন যদি দীর্ঘ হয় তবে সে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার এসবই তাকে সাহায্য করবে, বৈরী হবে না বলেই তার বিশ্বাস। আজিম কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, তার মায়ের কপালটা কেন ভেঙ্গেছিল। মা তার শ্রী প্রশীলা, নিজের মা বলে নয়, আসলেও অনেক গুণ তার মায়ের। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস সে পড়েছে সুযোগ পেলে এখনও 'চরিত্রহীন' পড়ে তা বোঝা যায় কারণ বালিশের পাশে প্রায়ই দেখা যা বইটির কোন না কোন পাতায় মুরগীর পালক রাখা। এই অভ্যাসটা আজিমকে মুগ্ধ করে। অজিম দেখেছে অনেকেই বইয়ের পাতা মুড়ে রাখে, কিন্তু মা এই পালক দিয়ে রাখার অভ্যেস কোথা থেকে কেমন করে যে পেল । সে নিজেও বইয়ের পাতা ভেঙ্গে ভাঁজ করে না, ঢাকায় বসে পালক দিতে পারে না কিন্তু অন্য কাগজ দিয়ে চিহ্নি রাখে। মার অভ্যাস থেকেই বোধহয় তারও উপন্যাস খুব প্রিয় কি সুন্দর সুন্দর ঘটায় সমৃদ্ধ একেকটা গল্পকাহিনী, এতো জিবন্ত মনে হয়। তার মা তো একেবারে শরৎচন্দ্রের নায়িকার মতো আদর্শ সুন্দর। কথা বলে গুছিয়ে, পরিপাটি পোশাক, বিকেলে খোঁপা, গুনগুনিয়ে একটু গানও করেন। মা শহরে মানুষ হয়েছেন। শিখেছেন অনেক কিছু, কিন্তু ভাগ্যক্রমে শ্বশুড়বাড়ী হ'ল গ্রামে। মনের ভিতরে এ নিয়ে কষ্ট আছে কিনা আজিম বুঝতে পারে না, মা তাকে কেন, কাউকেই কোনদিন বুঝতে দেয়নি। মা গ্রামের বাড়ীকেই নিজের মত করে গুছিয়ে নিয়েছিল, সব কিছুতেই তার পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি ছিল। দাদা দাদি না থাকায় গ্রামের বাড়ীটা দেখার ভার সবটুকু যেন মায়ের উপরে। বাবা নামের ভদ্রলোকটি যথারীতি ঢাকায় চাকুরী করতে থাকলেন ছুটি ছাটায় আসেন, জমি জমার হিসাব পত্র নেন, ব্যস এই পর্যন্তই। উনি কোন মাসে আসতে না পারলে জমি জমার লোকেরা মা'র কাছেই আসে। দায়িত্বভার নিতে নিতে ক্রমশই অভ্যস হয়ে উঠেছিল মা। আজিম দেখতো গ্রামের লোকেরা বরং মার সাথে কাছেই বেশী সহজ বোধ করত। আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে উনার দেশে আসা কমতে থাকলো। মার ভাবান্তর উপলবিদ্ধ করার মত বয়স বা বুদ্ধি তখনও হয়নি আজিমের। গ্রামের লোক কানাঘুষা করতো, মা'কে হয়ত কিছু বলার চেষ্টাও করতো, কিন্তু নিজস্ব বৈশিষ্টে সে দেখেছে মা ওদের কথা শোনার জন্য কখনই আগ্রহ দেখাতে না। কিন্তু আজিম যখন ক্লাস সিন্ধ ছাড়িয়ে সেভেনে উঠেছে তখন সে কানাঘুষার সত্যতা বুঝতে পেরেছিল । তার মা ভিতরে ভিতরে হয়ত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে কিনউ বাইরে এতটুকু বুঝতে দেয়নি। একদিন সকালে তার মাথায় হাত রেখে বলেছিল মা, তোমার মাথার উপর কিন্তু তেমন কোন ছায়া নেই, মজবুত কোন খুঁটি নেই, কিন্তু তোমাকে তৈরী হতে হবে। আমি আছি, তোমার মনবল যেন ভেঙ্গে না যায়। মা'র এই কথা থেকেই সে বুঝেছিল কেন এবার তার বাবা তার মাধ্যয় হাত দিয়ে দোয়া না করেই চলে গিয়েছিল। মনে পড়ল গতরাতে দু'একটা উত্তপ্ত কথাও বোধহয় সে শুনে ছিল। বাবা হয়ত কিছু বুঝাতে চেষ্টা করেছিল, সেগুলো সে শোনেনি, কিন্তু মা'র বলা স্পষ্ট উচ্চারণ সে শুনেছিল। আমাকে কিছু ব্যাখ্যা করার কোন দরকার নেই, যা করেছে নিশ্চয়ই বুঝেই করেছ, আমার মতামত নাওনি, তাতে কি হয়েছে, আমি এ নিয়ে কোর্ট কাচারি করব না। আমাকে পারলে না তবে যাকে নিয়ে নতুন সংসার বাঁধলে তাকে সম্মান দিও। এই ছোট মায়ের জায়গায় যিনি আছেন, তিনি সম্মান পেয়েছেন কিনা আজিম জানে না। কিন্তু নিত্য দিনেই তাদের যে দিনান্তের আচরণ দেখে সে, তাতে বড় কষ্ট হয় তার। এই সুখের জন্য কি কেউ স্বেচ্ছায় এ জীবন বেছে নেয় ? সবার কথাই আজিমকে বড় বেশী ভাবায় । বাবা নামের ভদ্রলোকটি কোনদিনই যখন নাস্তা খেয়ে অফিসে যেতে পারে না তখন তার খারাপ লাগে। গ্রামে কেটেছে বলে অভ্যাসটা হয়েছে, শুধু তাই নয়, মার কারণেও হয়েছে। মা নামাজ পড়তে ওঠে নামাজ শেষে কোরআন পড়তে যাওয়ার আগে রোজই দরজায় টোকা দিয়ে বলতেন 'খোকা' উঠবি ? আজিম সেই খোকা ডাক শোনার জন্য উদগ্রীব থাকতো। ছোট বেলা থেকেই শুনেছে সকাল বেলায় পড়া মুখস্ত হয়, অংক করলে অংক মিলে যায়, তাই কঠিন পড়াগুলো সকালে করতে হয়। সেই সকালে উঠার অভ্যাস এখনও আছে, সকালে সে নিরিবিলি এখনও লেখাপড়া করে, মার কথা ভাবে আর দেখে এ বাড়ীর গার্জিয়ান বা কর্তাব্যক্তিটি নিজে যাতে বাটিতে করে মুড়ি ঢেলে খায়, কলা খায়, নয়ত কোনদিন টোষ্ট বিস্কুট খায় । নিজের জামার হাত আর কলারটা নিজেই ইস্ত্রি করে নিয়ে গায়ে দেয়, জুতার ধুলা মুছে পাড়ে দিয়ে রওনা হয় অফিসে। যাবার সময় বলে খোকা দরজাটা বন্দ করে দাও। আজিম ঠিক তক্ষুণী বের হয় না, ওই মলিন মুখটা দেখতে কিংবা অপরাধবোধে ভারাক্রান্ত, সোজা হয়ে না দাড়াতে পারা ভদ্রলোকটির প্রতি তার মায়া হয়। কোন জবাব দেয় না আজিম, কিন্তু শিড়িদিয়ে জুতার শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই সে দরজাটা বন্দ করে। অত চিন্তিত লোকটিকে আর নতুন চিন্তায় সে রাখতে চায় না, অন্ততঃ এটুকু নিশ্চিন্ত হোক যে দরজাটা ঠিক সময়ে বন্দ হয়েছে, তার স্ত্রী ও কন্যার ঘুমের কোন ব্যাঘাত হবে না, ভয়ের কিছু নাই, দরজা বন্দ আছে আর আজিম ছেগে আছে। পদশব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগে মাঝে মাঝে হাজিম ক্ষীণ একটা বাক্য শুনতে পায়, খোঁকা নাস্তা খেয়ে নিও । আজিম মনে মনে হাসে, হায়রে তার নাস্তা খাওয়া সেই তো একই রকম, একবাটি মুড়ি, নয়ত টোষ্ট, একটা কাজ আজিম বেশী করে সে নিজের চা বানিয়ে নিতে পারে রান্নঘর থেকে। এ বাড়ীতে সকাল হয় দুই বার, একবার আজিম আর ও ভদ্রলোকের জন্য আরেকবার বেলা দশটার পর। কাজের বুয়া দরজায় খটখট করে, যথারীতি আজিম দরজা খোলে। বুয়া পরোটা বানায় ডিম ফেটে, এসব ভাজা শেষে টেবিলে লাগিয়ে রুক্মিদের দরজায় গিয়ে ডাকতে থাকে। আপা উঠেন, নাস্তা রেডি। বুয়া অন্যান্য কাজে হাত দেয়, দরজা খোলার শব্দ পেলেই আজিম কলেজে বেরয়ে যায়। যেদিন যখনই তার ক্লাস থাকুক না কেন, এর আগে তার যাওয়ার উপায় নাই, আর এ পরে সে থাকতেও চায় না । আজিম জানে বুয়াকে এ ভাবেই রাখা হয়েছে, অন্যত্র কাজ সেরে তারপর এখানে আসবে। তাদেরও নিদ্রায় ব্যাঘাত না হয় আর বুয়ারও যাই যাই তাড়া না থাকে। বুয়া মাছ মুরগী যা হোক কিনে এনে দুই বেলার রান্না করে দিয়ে যায় । রুক্মি কোন স্কুলে যে পড়ে, ক্লাস শুরু হয় বিকেল সিপ্টে, নেয়ে খেয়ে মা মেয়ে বের হলে ফেরে সন্ধায়। আজিম ফিরে এসে কোনদিন টেবিলে ভাত থাকলে খায় নইলে খায় না। কোনদিন বাবা ভদ্র লোকটি বাসায় ফেরার পরে তারা বাসায় ফেরে, সাথে ফাষ্ট ফুড থাকে রারাই খায়। শব্দ করে গান শোনে টিভি দেখে, অন্যের সুবিধা অসুবিধা দেখা বা শোনার বালাই নেই। একটি মিষ্টি সুরে কথা বা জিজ্ঞাসাবাদ নেই। কিন্তু নাই কথাতেই শুরু হয়ে যায় কলহ। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে কি কর কোথায় যাও ? এতো কান ফুটানো নাক ফুটানো, অলংকার পরা, সাজা, পার্লারে যাওয়ার দরকার কি ? কেন এসব কর ? কার জন্য ? মেয়েও তো মা'র মতই দেখছে শিখছে। তক্ষুনী ঝড়ের বেগে উত্তর দেওয়া শুরু হয়। আমি সাজি তাতে তোমার কি ? আমি কি তোমার মত বয়স্ক বুড়ো হাবড়া যে আমার মনে শখ আহল্লাদ থাকবে না ? আমি যা খুশী তাই করব যেখানে খুশী। সেখানে যাব, সে জন্য তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে ? স্বামী বলেই ভেব না যে মাথা কিনে নিয়েছ। আগের বউ রেখে আমাকে বিয়ে করেছ কেন ? নিশ্চয়ই সেও তোমাকে সহ্য করতে পারেনি বলেই তুমি আমার কাছে ধন্না দিতে ? আমাকে সন্দেহ করবে না বুঝেছ ? নিশ্চয়ই তুমিও জান যে তুমিও সন্দেহের বাইরে নও । আজিম মুখ চোখ কষ্টে লাল করে, তার পবিত্র মায়ের প্রসঙ্গ উঠলে আর সহ্য করতে ইচ্ছে করে না, তবু পড়ায় মন দেয়। যেদিন সন্ধ্যাতেই শুরু হয়ে যায় রাতে তার আর খাওয়া হয় না। রুক্মি খুব জোরে টি,ভি, ছেড়ে হিন্দি চ্যানেল দেখে ।
Read Also :-
Labels :
#পথের শেষ কোথায় ,#পুলিশ গল্প ,
Getting Info...