আফাজ মুন্সির কড় চা

আফাজ মুন্সির কড় চা
 আফাজ মুন্সির কড় চা

আফাজ মুন্সির কড় চা


মুন্সি আফাত উদ্দিন ক’দিন ধরে খুব বেশী বিড়বিড় করছে। সারাক্ষন তসবীহাতে ঘর বার ঘর বার করছে। বয়েস তার সত্তর পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনও সচল— সবদিক থেকে। ছোট বিবির সাথে হাসি তামাসা, গান নেবার সময় চোখ সরু করে তাকানো, অযথা যখন তখন গলা খাকারি দিয়ে কাশি দিয়ে বিবিকে কাছে এনে পা টিপে নেওয়া এসব তার স্বভাবের মধ্যে। সে পুরুষ মানুষ, কচি হাতের পরশ না পেলে সজীব থাকবে কি করে ? কিন্তু ক'দিন থেকে যে কি হলো ? ব্যতিক্রমটা ছোট বিবিও লক্ষ্য করেছে। মুন্সিজী তাকে ডাকাডাকি করছে না বলে তার ঠোঁট ফুলে রয়েছে । সেও গজগজ করে চলেছে তবে ভিতরে ভিতরে মুখ একেবারে গোমরা থমথমে চোখেও পানি টসটস করছে । এই পড়ে এই পড়ে তার । এতো কাজ করা তার পোষায় না। কাজ করবে বলে কি সে এই বুড়ো মুন্সিকে বিয়ে করেছিল ? ছোট বউ পায়ের উপর পা তুলে পান খেয়ে ঠোট রাঙ্গিয়ে থাকবে এ রকমই তো কথা। কাজ করতে হবে না বলেই তো এই বুড়োকে স্বামী বলে মেনেছে সে। কচি ঠোটের ইশারায়, বাঁকা চোখের ঠারে সে মুন্সীকে বশ করে নিয়েছে সে তো সবাই জানে। সবাই জানে মুন্সিজি সে কোন কাজের অজুহাতে যখন তখন ছোট বিবিকে ডাকে। আর এই ডাকবে বলে কোন ভারী কাজ নিয়ে সে কখনও বসে না। আর অন্যরাও তাকে তেমন কাজে ডাকে না, ডেকে লাভ নাই বলে। তাকে কাজ করতে হয় না এই খুশীতেই তার ডগমগানি থলথলে শরীরটা নিয়ে। ঘরে গিয়েই দরজা চাপিয়ে দেয় ছোটবিবি পান সাজেখুব ধীরে ধীরে, নিজে নেয় মুন্সিজির মুখে তুলে দেয়, পাশে বসে পাকাচুল বাছে, কিংবা বাছার ভান করে, কিছুক্ষন শুয়ে থাকে তারপর বের হয়। এভাবেই শুয়ে বসে আলসেমিতে দিন কেটে যায় তার। নিজের ছেলে মেয়ে দু'টোই বড়মা বলতে অজ্ঞান । ছোটবিবি তাতেই খুশী। কোন ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় না বলে। প্রথম প্রথম মুন্সিজি খুবই সন্দেহের চোখে দেখতো ছোট বিবিকে। ভীষন আশ্চর্য হয়ে যেত তারমতো একজন করেছে বয়স্কর প্রতি এতো টান দেখে । নাই কথাতেই দৌড়ে দৌড়ে আসে অথচ এখন বয়সের ফারাক দ্বিগুনেরও বেশী ছিল । বিয়ের সময় ছোটবিবির বয়স বড়জোর পনের কি ষোল হবে আর মুন্সি আফাজ উদ্দিনের প্রায় চল্লিশ। তবু নতুন বিবি তার কাছে থাকতেই ভালোবাসতো। ক'দিন পরেই বুঝতে পেরেছিল আসলে ছোটবিবির কাজের আলসি। তার নাকি কাজ করতে একটুও ভালো লাগে না শুধু নিজের গোসন খাওয়াটুকু ছাড়া। নতুন বৌয়ের এরকম কথায় খুবই মজা লেগেছিল । মুন্সি — বলেছিল, তোমার আবার কাজ কি, তুমি শুধু আমার কাছে কাছে থাকলেই হবে । কোন কাজেরই দরকার নাই শুধু আমার তেলটা পানিটা পানটা আর বলে মুচকি হেসে চোখ টিপেছিল। ঢলঢল চমৎকার স্বাস্থ্য নিয়ে উঠতি বয়সের উচ্চলতা নিয়ে কেঁপে কেঁপে হেসেছিল ছোটবিবি। সে হাসিতে উথলে উঠেছিল মুন্সি, বিভোর হয়েছিলো অনেক অনেক দিন। অভাবের সংসার নয় বলে এতে কোন অসুবিধাও হচ্ছিল না। তবে ছোট— বিবির ওই হাসিটা আজও আছে কিনা, কিংবা কতদিন ছিলো সে হিসাব মুন্সি কখনও করে নি। কিন্তু মুন্সি এটুকু বুঝেছিলো যে ছোটবিবি আর যাই হোক তাকে পেয়ে সুখী না হলেও খুশী ছিলো। কারণ তার খাওয়া পরা আর ঘুমের কোন অসুবিধা ছিলো না। আর ছোটবিবি এই তিনটার বাইরে আর কিছু বোঝে বলে তেমন মনে হয়না আর এখন তো বয়সের জোয়ার প্রায় যেতেই বসেছে । আর সে জন্যই ছোটবিবির আলসেমীটো আরও একটু বেড়েছে আর বেড়েছে বলেই ক'দিন থেকে মুখটা তার গোমরা। সে মুন্সি ডাক পাচ্ছে না আর পান বানানোর নাম করে অনেকক্ষন ধরে শুয়ে বসে ঘরে কাটাতে পারছে না। গেরস্থ বাড়ীরতো আর কাজের অভাব নেই। ধান ভাপানো সুকানো, বারাভানা চাল ঝাড়া, ধান উড়ানো, খড় সুকানো কিছু না কিছু বারো মাস লেগেই থাকে। ধানই সে কতবার আর কতকত রকম হয় । মনে মনে ভীষন বিরক্ত হয় ছোটবিবি, বড়বউয়ের উপর। পারেও বড়বু, বারোমাসের তেরো পার্বন সামলাতে। ধানের পরে পাট, সরিষা, কাউন, তিল, তিসি বজরা এখন আবার গমও হয় জমিতে। মুখ বুজে সবকিছু সামাল দেয় বড়— কেমন করে যে করে । কেন বাবা ? মুন্সিবাড়ীর বড় বউ, বসে বসে কাজের লোককে হুকুম করলেই হয় ? তা না তিনি নিজে তাদের সাথে করবেন। অন্ধকার থাকতে ধান সিদ্ধ করতে উঠবেন, উঠান গোবর গোলা পানিতে লেপবেন সেও সূর্য ওঠার আগেই । আর সারাদিন ধরে উল্টে পাল্টে ধান শুকাবেন। কাকেরা যে ধান ঠোট ভরে নিতে না পেরে কত অভিশাপ দেয় তা যদি বড়বু বুঝতো। ঢেকিতে ধানভানতে উঠবে সেই সুকতারা ঢলে পড়বার আগেই— আর সেই সন্ধা পর্যন্ত চললো তো চললোই, নাওয়া খাওয়ারও বালাই নেই । অবশ্য এই বড়বু আছে বলেই এতো ঝরঝরে আর নিশ্চিন্তে চলছে সংসারটা এসছে অবধি তো সে মুন্সিজিকে গায়েবাতাস লাগিয়েই চলতে দেখছে, আর বড়বু যেন দাসযত লিখে দিয়েছে সমস্ত সংসারটাকে টানার জন্য । সতীন হয়ে স্বতীনের প্রতি এতটুকু হিংসা পর্যন্ত করে না । বড়বু একদিনও সে বলেনি, ছোট তুই বস একটু চুলার পাড়ে আমি মুন্সিজিকে পান সেজে দিয়ে আনিনি বরং প্রথম প্রথম তাকে বলেই দিতো, যা না ঘরে, মুন্সিজি একা আছে । নিজের বড় বোনও বুঝি হিংসা করে এতে কিন্তু এই সতীন বড়বু কোনদিন করেনি । রোগাপাতলা শরীরটা নিয়ে বড়বু যে এতোও খাটতে পারে, অবাক হয়ে যায় ছোটবিবি । কোন সাজগোজ নাই বায়না আদার নাই, যেন একটা মেশিন একেবারে । আর বড়বুর ছেলেটাও হয়েছে অমনি রাজশাহীর কলেজে না ইউনিভারসিটিতে কোথায় যেন পড়ে পড়ে পড়া শেষ করেছে— এখন ব্যাংকে না কোথায় জানি কাজ করে । মাঝে মধ্যে বাড়ীতে আসে, শুধু মা'কে দেখতে । থাকে খুবই কম । ছোটবিবির একথাভাবার কারণ যে কোন কোন বারমুন্সিজীর সাথে দেখা না করেও ছেলে আজাহার কাজের তাড়ায় চলে গেছে । আগে বাপ বেটায় তবু দু একটা কথাটথা বলতে শুনতো আজকাল তাও শোনে না, আসলে আজহারতো রোজগারই করে— তাই আর কিছু বোধহয় চাওয়ার নাই তার । আর আশ্চর্য বাপ বেটায় এতো ফারাক সে কখনও দেখে নাই । কি ভীষন চালাক চতুর বাপের কি ভীষন সরল সাপটা ছেলে । বাপ পারলে এখনও দাড়ির আড়ালে ইরাশারো করে আর তার ছেলে চোখটা তুলে কোনদিন তাকায় না। বরং ছোট সৎ ভাইবোন দুটোকে কত যে আদর করে। প্রত্যেকবার নতুন নতুন বই নিয়ে আসে, পড়ার কথা বলে । বড়বুও যেমন তার ছেলেও তেমন, একটুও হিংসা করেনা তার দুটোকে ।বড়বুতো যন্ত্রের মতো কাজ করে । শুধু আজাহার যেদিন আসে সেদিন একটু চঞ্চল হয় । ভাপা পিঠা করে, মুড়ির মোয়া বানায় হঠাৎ আসলে জোড়া ডিমের ভাতা দিয়ে ভাত দিয়ে তাড়াতাড়ি মুরগী ধরতে ছোটে, ছোট দুটোবড় মা'র পিছনে ঘুর ঘুর করে । তেলের পিঠার প্রথমটা এরাই পায় ।ছোটবিবর আসলে আরামের কোন অভাব নাই আর কোন ব্যাপারেই চিন্তারও কোন কারণ নাই । কিন্তু গতমাস থেকে একটু একটু যেন ভাবনা হচ্ছে । সে শুনেছে, আজাহার নাকি তার মা'কে মনে বড়বুকে শহরে তার কাছে নিয়ে যেতে চায় । বড়বুু কি বলেছে তা অবশ্য ছোটবিবি জানে না কিন্তু বউবু যদি যায় তার গেলে তারপর কি হবে তাই নিয়েই তার ভাবনা হচ্ছে। ভাবনা হচ্ছে তার নিজের ছেলেমেয়ে দুটোরই বা কি হাল হবে । তাদের তো বড়মার কাছেই শোয়া ওঠা বসা যাওয়া আবার পড়াও । সেতো কিছুই পড়তে পারে না বড়তো সে সময়ের ফাইভ পাশ। একবার যদি আজাহার তার মাকে নিয়ে যায় তাহলে কি করে চলবে এই সংসার ? একেতো এই ভাবনাতেই ভালো করে ঘুম হচ্ছে না তার, তার উপর মুন্সিও যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে ক'দিন ধরে । চাল ঝাড়তে বসে ছোটবিবির চাল ঝাড়া আর এগোয় না, বারবার তাকায় ঘরের দরজার দিকে কিন্তু ভিতর থেকে কোন ডাকা আসে না। রাগে অভিমানে ফুসতে থাকে, নিজের থেকে উঠে ঘরে যেতেও ইচ্ছে করে না, অথচ হাতদুটো ব্যাথায় ভারী হয়ে ওঠে ছোটবিবির।মুন্সি আফাজ উদ্দিন কদিন ধরে বিড়বিড় করে গালমন্দ করছে সরকার বাড়ীর ছেলেগুলোকে। ছেলোগুলো সব আলাদা হয়ে গেছে । ভাগাভাগি হয়ে গেছে সব। জমি জমা সবতবাড়ীরও। সরকার সাহেব তো গেছে সেই যুদ্ধের সময়ে । এই গ্রামে হানাদারের প্রথম শিকার ছিলো সরকার সাহেব, তা যাকগে, সরকার সাহেবের ছেলে চারটার অভাব আছে এমন কথা কোনদিন মুন্সি শোনেনি । সরকার বেঁচে থাকলে মুন্সির সাথে যে লেগে থাকতো তা ঠিক কিন্তু ছেলেগুলো কোন সাতে পাঁচে নাই । বোধহয় বাবাকে হারিয়েই শিখেছে। সরকারতো নিজের খেয়ে নিজের দিয়ে শুধু পরের উপকার করে বেড়াতো । সরকারের সাথে তার কোনদিনই মিল মহব্বত ছিলো না, কারণ সরকার আসলেও উঁচু দরের মানুষ ছিলো । মুন্সির সাথে মেলামেশার কথা বোধহয় তার মনেও আসেনি কখনও । একটু বেশীভালো মানুষ ছিলো সরকার। খান সেনারা ঠিকই বুঝেছিলো, নিজেদের মনের মতো মানুষ মুন্সিজিকে আপন করে নিয়েছিলো, বলেছিলো মুন্সিজির মতো মানুষ হয় না— আর সরকারেরা হলো দেশের শত্রু। তা থাকগে, অতীতের কথা অতীতে ডুবে থাক। কিন্তু এ কি করছে সরকার বাড়ীর ছেলেরা ? একটা বুড়ো আমগাছের কি এমন দাম যে ওটাই ওদের কাটতে বসতে হলো । কিংবা টাকার দরকারের ব্যাপার— টা বাদ দিলে ওই আমগাছটা ওদের কিইবা অসুবিধা করছিলো যে ওটা কাটতে হবে ? একটা বুড়ো আমগাছ ছাড়িয়ে রয়েছে তো বাবা কি ক্ষতি হয়েছে তোদের ? না হয় বছর কয়েক থেকে ফলই দিচ্ছে না—কিন্তু ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে তো রয়েছে । ভেতরে ঝাক্কড়া হয়ে কোটার হয়ে গিয়েছিলে ? হয়ত বা তাই । কিন্তু মুন্সিজির এটা মোটেই সহ্য হচ্ছে না। আজ ক'দিন হলো দুটো বাচ্চা ছেলেকে দিয়েছে গাছের ছোটছোট ডালগুলোকে কাটতে। গাছটাতো আর কম বড় কম ঝাকড়া নয়, আর তার ডালপালা শাখা প্রশাখারও হিসাব নাই । ছেলে দুটো কদিন ধরে মগডালে বসে বসে প্রথমে পরাশুন্য করেছে গাছদুটোকে। তারপর কাটলো চিকন চিকন ডালপালাগুলো। এসব দেখতে ভীষন খারাপ লাগছে মুন্সিজির। ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালাটা খুললেই এত— দিন ধরে মানে জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে যে গাছ সে গাছটার এই পরিনতিতে মনটা বিষাদেভরে ওঠে মুন্সিজির । দক্ষিনের জানালাটা সে সবসময় খোলাই রাখে। গ্রামের খোলা আলো বাতাস হু হু করে জানালা দিয়ে আসে আর চোখ জুড়ানো গাঢ় সবুজ রংয়ের আমপাতায় শান্তশী ডাক প্রচন্ড গ্রীস্মের সময়ও শান্তি যোগাত । সরকার বাড়ীর গাছ হলে কি হবে গাছটার গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত সেই তো দেখতো । উপভোগ করতো তার রুপ । গাছ— তলায় ছেলেদের মার্বেল খেলা, ছকএকে বাগবন্দি খেলা, কাঠের টুকরো দিয়ে ডাংগুলি খেলা সবই সে দেখতো, কারণ ক'বছর থেকে তো সে মোটামুটি ঘরেই থাকে বাইরের কাজ যখন থেকে কমে এসেছে তখন থেকে তো এই দক্ষিণের জানালার ধারের খাটে শুয়েই তার সময় কাটে । এই গাছতলায় ছোটদের কীর্তিকলাপ সে উপভোগ করে, স্কুলের ছেলেরা লুকিয়ে লুকিয়ে কিভাবে প্রথম সিরারেট খেয়ে খকখক করে কাঁশে আর এদিক ওদিক তাকায় । ওদের ফিসফিস করে কথাবলার ভঙি দেখে আঁচ করে তারা কি কথা বলছে । নিশ্চয়ই কোন মেয়ে নিয়ে গোপন কিছুর কথা বলছে। কথা বলার ধরণ ধারন চলাফেরার ভাব ভঙ্গি দেখেই সে বলে দিতে পারে যে তাদের বিষয়টা মোটামুটি কি। গাছতলাটা একেবারে ছিমছাম পরিষ্কার দেখে মনে হয় যেন কেউ লোপ রাখে রোজ রোজ । অবশ্য কোন না কোন দিক রোজই ঝাড়া মোছা পায়, মেয়েরা রাব্বাবাড়ী খেলার সময় গাছের ডালের পাতা দিয়ে ঝাড়দিয়ে নেয় । কিন্তু আজ ক’দিন সে গাছতনায় আর এসব কিছু নাই। শুধু ছাগল চরছে ।  খুব খুবই খারাপ লাগছে মুন্সিজির, সে সারাক্ষন গালমন্দ করছে সরকার বাড়ীর ওই ছেলেগুলোকে। ওই গাছটা যেতার এতো আপন ছিলো, গাছটার জন্য যে তার এতো মায়া ছিল এখন যেন সে সেটা বুঝতে পারছে। সে যেন ভিতরে ভিতরে আরও কিছু বুঝতে পারছে । গাছটার একটা একটা ডান কাটছে না যেন তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাটছে। গাছটার জন্য যেন তার উদগত কান্না ওঠে আসতে চায়, যতই গাছটা ন্যাড়া হচ্ছে ততই যেন অস্থির লাগছে তার। যতই মনে মনে ভাবছে মুন্সিজি, যে এটা তার গাছ না, এই গাছ কাটা না কাটায় তার কিছু যায় আসে না, তবু ভেতর মনে কি যেন কি কাজ করে যাচ্ছে, বড় দুর্বল দুর্বল লাগছে হাত পা যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে । চিৎকার করে মনেমনে বলছে, থামাও থামাও গাছ কাটা থামাও । অস্থির গায়ে বদনা দিয়ে বার বার আসা যাওয়া করছে, পান তামাকের কথা মনেও আসছে না, মনে আসছে না ছোট বিবিকে ডাকার কথা । হাত পা যেন অবশ হয়ে আসছে তার । পরনের কাপড়টা কি ভিজে গেলো, তা যাকগে সে উঠতে পারছে না তার, কিছুতেই উঠতে পারছে না। ছোটবিবি কুলা হাতে তুষভরা চাল ঝাড়ে ।  বসেছে সেই কখন কিন্তু ঝাড়া চাল স্তুপ হয়ে ওঠে না, আচল দিয়ে চোখ মোছে বার বার । বড় বড় তা দেখতে পায়, সে অবশ্য এ কদিনকার ব্যতিক্রমটাই লক্ষ্য করে চলেছে । সে নিরবেই দেখছিল কিন্তু ছোটবিবির কান্না দেখে কিছু না বলে পারল না। জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে ? কি হয়েছে যে কাঁদছিস ? শরীর খারাপ লাগলে শুয়ে থাকগে যা। তোর কি কাজে অভ্যেস আছে যে সারাদিন কুলা ধরে বসে আছিস ? যা পান খাবে যা। বড় বউ আদরের সাথেই বলে, আর বলার এই আদরের সুরটুকু ছোটববিকে ডুকরে কাঁদিয়ে তোলে । ডুকরে ওঠে বড় বউয়ের বুকে মুখ রেখ বলে, বড়বু, আমাকে যে ডাকছে না, কয়েকদিন ধরেই ডাকছে না, আমার বুঝি রাগ ঝাল নাই ? আমার বুঝি মান নাই ? কাকে যেন বিড়বিড় করে খালি গালমন্দ করছে মুন্সিজি। আমি ঘরে গেলেও খেয়াল করে না। পান চেয়েও খায় না, কয়দিন থেকে ভাতও খুব কম কম খায় বা কাল রাত্রে ওই দক্ষিণের জানলাটা একবার নাগায় আর একবার খোলে, আবার লাগায় আবার খোলে । কি যেন তাকায় তাকায়, দেখে আর বলে । একটুও ঘুমায় নাই সারারাত। বলতে বলতে ডুকরে ডুকরে কাঁদে ছোট বিবি, বড়বুর বুকের আঁচলে তার নাকের পানি চোখের পানি, বলে । আমিও সারারাত ছুই না পর্যন্ত । আমাকে না বললে আমি কিছুই করবো না, আমার বয়েই গেছে ওই বুড়ার হাত পা টিপতে, মাথা নেড়ে দিতে। বড়বু, তুমি যাওনা ভালই করো, মুন্সিজি নিমকহারাম, এতোদিন আমার সেবা নিয়ে এখন আমার থেকে মুখ ফিরিয়েছে, মনে হয় মনে মনে অন্য মতলব ফাঁদছে, আমি কিন্তু বড় তোমার মতো ভালো মানুষ না, আমি কিন্তু এই ঘাটের মরাকে আবার বিয়ে করতে যেতে দেব না, কিছুতেই সতীন আনতে দেব না কিছুতেই না। মুন্সিজির হাড় একেবারে কালি করে দেব তুমি দেখে নিও । বড়বউ বিষয়ে ছোটবিবির মুখের দিকে মুখ তুলে নিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, এ রকম কথা মুন্সিজি বলেছে কি না । সে কি নিজে থেকে বিয়ে করার কথা বলেছে ? ছোট বিবি বলে, বলতে হবে কেন, আমি কি বুঝিনা ? ঔয সে ভড়ং ধরে— ছে ওতেই আমি বুঝেছি । বিড়বিড় করে বলতে বলতেই দেখো তুমি, মুন্সিজির ঠিক বিয়ের কথা বলবে । বড়বউ বলে, তোকে না হয় এনেছে, আনার কারণও ছিলো, কিন্তু মুনন্সিজি আরেকটা বিয়ে করবে এই বয়সে তা আমার মনে হয় না । তুই বরং ঘরে যেয়ে একবার দেখেই আয় সারাদিন তো খোঁজ করলি না, বললি ভালো করে খায়নি পর্যন্ত শরীর টরীরও তো খারাপ হতে পারে । আর কান করে খেয়াল করে দেখিস কি নিয়ে কথা বলছে একা একা । গাঁয়েও একটু হাত দিয়ে দেখিস জ্বরজাড়ী হয়েছে কিনা —এই বলে জোর করেই পাঠিয়ে দেয় ছোটবিবিকে । সারারাত এতটুকুও ঘুমাতে পারেনি মুন্সিজি, জানালা দিয়ে বার বার গাছটাকে দেখেছে । গাছের ডালে বাসা বঁধা পাখিগুলো কোথায় চলে গেলো ভেবে আতকে উঠেছে তার প্রান । সে জানালা বন্ধ করে চোখ বন্দ করেছে। মনে মনে ভেবেছে পাতা ভর্তি গাছটাকে, কাকের বাসায় ককিলের ডিমপাড়া বুঝি সে সকালেই দেখতে পাবে, কান পেতে থেকেছে এই বুঝি শুনবে আমগাছটা থেকে ডাহুক ডাকছে । সে কাঁপা হাতে জানালা খুলেছে আশায় আশায় । আবার তখনী তখনী বন্ধ করেছে। বাস্তবের সত্য রূপের ভয়ে । সারারাত ধরে তার বিরামহীন এই সব চিন্তায় সে ওঠাবসা করেছে । কিন্তু আজ তার তাও বন্ধ হয়ে গেছে । জানালার শিক ধরে সে ঠায় বসে আছে। সকালের দুধটুকু খাওয়ার সময় কষাবেয়ে কিছুটা পড়ে গিয়েছিলো দাড়িতে, সেটুকুও মোছা হয়নি, চটচট করছে গালটা দাড়িটা । সারা দুপুর গাছটার গায়ে কুড়ালের কোপ পড়েছে । আজ আর ওই ছোটছেলে দুটো না আজ দুটো জোয়ান কামলা কাজ করছে । অবিরাম কুড়াল মারছে দুইজন ছন্দে ছন্দে, এ উঠানে ও নামায়, ও উঠানে সে । খট খট খটা খট। মুন্সিজির বুকে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ । সে শক্ত করে ধরে আছে শিকটা মুঠি করে, না সে ছাড়বে না কিছুতেই ছাড়বে না । সে শক্ত করে ধরে থাকলেই বুঝি দাড়িয়ে থাকবে গাছটা । বুকের ভেতরের চিনচিনে ব্যাথাটা ক্রমশই বেড়ে চলেছে । পেশাবের ব্লাডারটা চাপ দিছে বার বার আর একটু একটু বের হয়ে যাচ্ছে। তবু শিক চেপে অনড় বসে রয়েছে মুন্সি। প্রায় নিষপলক চোখ স্থির হয়ে রয়েছে গাছটার প্রতি । দুপুরের পর বিকেলের দিকে বেশ ভীড় জমে রয়েছে গাছটাকে ঘিরে । নানা বয়সের ছেলেরা কিছু ছোটমেয়েও প্রয়োজনমত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে । গাছটার গায়ে খেচিয়ে পেঁচিয়ে রশিবাঁধা হয়েছে । দুইজন লোক কুড়ান দিয়ে কেটে চলেছে আর বেশ ক’জন মিলে দড়ি ধরে টান মারা হচ্ছে, হেইও হেইও । ছেলেরা আনন্দের আতি— শয্যে দড়িতে গিয়ে টান দিচ্ছে ওদের সাথে । মুন্সিজির বুকব্যাথা করে ওঠে মোচড় দিয়ে ওঠে বার বার কি এক ভয়ে অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে তার বুক । সে চিৎকার করে ওঠে বলে, না না না আমি পড়ব না আমি পড়ে যাব না, যাব না । এইভাবে বিকার গ্রহের মতো শিক ধরে দুলে দুলে বলতে থাকে মুন্সিজি, একই কথা বার বার বার বার । সরকার বাড়ীর গাছটা তালে তালে দুলতে থাকে টানের সাথে সাথে হেঁইও, হেঁইও । ওদের ইচ্ছা সূর্য ডোবার আগেই গাছটা ফেলা চাই । ছোট বিবি ঘরে ঢুকেই এক চিৎকার দিয়ে ওঠে। মুন্সিজির আপন মনে দোলা দেখে তার ভয় লাগে । জ্বিন ধরেছে জ্বিন ধরেছে বলে চিৎকার করে সে। চেষ্টা করেও সে মুন্সিজির হাতের মুঠি আলগা করতে পারে না, দুলুনি থামাতে পারে না, দেখতে পায় গন্ধ পায় ভিজে ফেনা কাপড় কাঁথা । এটারে সে ভয় পেয়ে ছুটে ঘরের বাইরে এসে চিৎকার করে । বড়বউ ছুটে যায় ঘরে । কতদিন পরে সে এই ঘরের দাওয়ায় পা দিচ্ছে ? সে অনেকদিন, অনেক মাস, অনেক বছর । কিন্তু এখন তো সে সব হিসেবের সময় না । সে ছুটে গিয়ে দেখে মুন্সিজি শিক ধরে দুলেই চলেছে । ছোট বিবি মুঠি আলগা করানোর চেষ্টা করেও তা পারছে না । আর সে চিৎকার করে চলেছে জি¦ন ধরেছে জ্বিন, ভূত ধরেছে ভুত । বড়বউ খুব ধীর পায়ে মুন্সির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বড়কে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছোট বিবি, সে মেঝের মাথা খুড়তে থাকে কেঁদে কেঁদে । বড়বড় খুব আলতো হাত রাখে মুন্সিজির হাতে উপরে । হয়ত মুন্সিজি বড়বু কথাটা শুনে থাকবে নয়ত ওইটুকু হাতের পার্শে কে জানে, বড়বউয়ের দিকে চোখ মেলে তাকায় । নিষ্পলক তাকায় কিছুক্ষন তারপর দুফোটা পানি গড়িয়ে পরে। বড়বউ আঁচল দিয়ে মুছাতে গেলে, যুঠি আলগা হয়ে গড়িয়ে পড়ে সে বড়বউয়ের কোলে । অস্ফুটে বলতে থাকে, বড়বউ বড়বউ । তারপর জ্ঞান হারায় । দুদিন পর জ্ঞান ফিরলেও মুন্সিজি নিজে আর পাশ ফিরতে পারে না, বড় রকম স্ট্রোকের থাকায় শুধু এক হাত আর কথাবলার শক্তিটুকু রয়েছে। তবু সে কথা বলা সাধারণ মানুষের কথা বলা না। বক্তার প্রচন্ড চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফলে স্রোতা কতটুকু বোঝে বলা মুসকিল । অক্লান্ত হাতে সেবা করে বড়বউ । চোখের সামনে বড় বড়কে পেলেই কি যেন বলতে চেষ্টা করে ভালো হাতটা দিয়ে আঁকড়ে ধরতে চায় বড়— বউয়ের আঁচল কথা বলার চেষ্টায় চোখ গড়িয়ে পানি বয়ে যায়, মুখ দিয়ে থু থু ছিটে ফ্যানা জমে, বড়বউ মুছে দেয় যত্নের সাথে, তখন যেন আরও বেশী পানি গড়ায়, কথা বলার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় । বড়বউতো জানে কি এতো কথা মুন্সিজি বলতে চায়, কেন সে এতো চেষ্টা করে চলেছে, নইলে যে তার শান্তি নাই, মরে গিয়েও শান্তি নাই । অপরাধবোধের তীব্র জ্বালায় আজ এইচেষ্টা মুন্সিজির । বড়বউয়ের কাছে তার যে ক্ষমা চেয়ে যেতেই হবে । আর সেই চেষ্টাই অনবরত করে চলেছে মুন্সিজি । বউবউ শান্ত হাতে প্রবোধ দেয়, চুপথাকতে বলে, শান্ত হয়ে ঘুমাতে বলে কিন্তু মাথা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে মুন্সিজি শুধু না নাই করতে থাকে । যেনো অবোধ শিশু হয়ে গেছে মুন্সিজি । এ মুন্সিজি কেমন মুন্সি ? দাড়িভরা গাল মুছাতে মুছাতে ভীষন নতুন নতুন লাগে বড়বউয়ের । মুন্সিজি কবে থেকে দাড়ি রাখলো ? একাত্তরের যুদ্ধের শুরুতেই দাড়ি রেখেছিলো মুন্সিজি । দাড়িভরা গালের সাথে খুব বেশীদিন পরিচিত হয়নি তখন । তারপরই এসেছিল সেই দুর্যোগময় রাত । সে রাতের পর থেকে মুন্সিজিকে আর স্পর্শ করেনি সে। স্পর্শ করতে ঘেন্না করেছে তার, গত আঠারো বছর ধরে সে মুন্সিবাড়ীর বড় বউ হয়ে রয়েছে শুধু লোকলজ্জা, সমাজ আর মানসম্মানের খাতিরে । সে মুন্সিজির স্ত্রী হয়ে নয় যেন শ্রমের বিনিময়ে রয়েছে । এবারে সে চলে যাবে ছেলের কাছে। ছেলে তাকে বার বার নিয়ে যেতে চাচ্ছে গত দু'বছর থেকে । মুন্সিজির এই মুর্মুর্ষু সময়ে কি তার ছেলেকেও খবর দেবে বড়বউ ? ঠিক বুঝতে পারছে না সে। সে স্ত্রী সে নিজে মুন্সিজিকে ক্ষমা করতে পারলেও ছেলে আজাহার পারবে কি ক্ষমা করতে ? পারবে না বলেই বিশ্বাস বড়বউয়ের কারণ, সে দেখেছে ছেলে কোনদিনও প্রয়োজনের বেশী একটা কথাও বলেনি মুন্সিজির সাথে মাত্র সাত বছরের চঞ্চল প্রানবন্ধু একটা শিশু ছেলেকে কি রকম শান্ত আর গম্ভীর করে দিয়ে গেলো । আজাহার ছোট ছেলেটা আর কোনদিন কোন আবদার করতে শিখলো না, কোনদিন উঁচুসরে কথা বললো না, মা ছাড়া কাউকে ভালোবাসে না, বিশ্বাস করলো না পর্যন্ত । একটা যুদ্ধ একাত্তরের যুদ্ধ শিশু ছেলেটাকে একদিনেই বয়সকো করে তুললো, তার মধ্যে চিরন্তন এক ঘূনা জন্ম নিলো, সে তার বাবার কাছে হয়ে উঠনো দুর্বোধ্যতম শিশু তার মায়ের কাছে আপনের চেয়েও আপন । কেবল বাকশিখা মোরগ কিংবা ডেকি মুরগী ভুনা করিয়ে অনেকদিন নিয়ে গেছে মুন্সিজি মেজর সাহেবের ক্যাম্পে । গরুর সিনার ঝান ঝোলও গুলো অনেকবার করে দিয়েছে, তেজে দিয়েছে গরম গরম পরাটা আর টিফিন কেরিয়ার ভর্তি করে নিয়ে গেছে মুন্সিজি। বড় বউয়ের আজ বড় কষ্ট হচ্ছে, মুন্সিজির জন্য তার সেবার হাত উঠতে চাচ্ছে না আজ। মুমূর্ষু মুন্সিজির বিছানোর কাছে একটা দড়ির মোড়ায় বসে রয়েছে বড়বউ । ভাবলেশহীন অনড় যেন সে । আজ তার মনে অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন, অনেক চিত্র আসছে আর যাচ্ছে, আবারফিরে ফিরে আসছে । মুন্সিজির মুখের দিকে তাকাতে পারছে না, চোখে চোখ না রেখেও বুঝতে পারছে মুন্সিজির এ কিসের আকুতি । তবু যেন বড়বউয়ের এতটুকু মমতা আসছে না, খরখর করছে চোখদুটো একটু পানি বয়ে গেলে যেন ভালো হতো । অন্ততঃ চোখের জ্বালাটা কমতো । বড়বউ মনে মনে আগুড়ায়, আজ কেন এতো এমন করছ মুন্সিজি, কেন আজ এতো ক্ষমা চাওয়ার অপচেষ্টা ? তখন তো তুমি বার বার বলাতেও বুঝতে না এতটুকুও বুঝতে না, ভারতে যে দিন এসেছে সে দিনই বুঝি রয়ে য়াবে চিরকাল, তোমার দিন বুঝি শেষ হবে না কোনদিন, তুমি যে বিশ্বাস ঘাতকতা করছ তাতো তুমি নিজেও জানতে, জানতে না কি প্রত্যেক রাজাকারের মতো ? তোমরা যে দেশের শত্রু তাতো প্রত্যেক আল সামস, আল বদরের মত তুমিও জানতে । তোমরা নিজেরাও নিশ্চয়ই ভালো করেই জানতে কতবড় চাটুকার ।কতবড় দালাল তোমরা ছিলে ? কিছু বললেই বলতে, তুমি মেয়ে মানুষ অতো বুঝবে না, চুপ করে থাকো । যা বলছি করে ভালো ভালো রান্না বেঁধে দাও। বলতে, ওপারে যারা চলে গেছে তারা গেছে আর যারা না গেছে তাদের এসব করতেই হবে । মিলিটারীদের সমর্থন করেই থাকতে হবে । বলতাম, সমর্থন করা এক আর তোয়াজ করা অন্য কথা, তেল দেওয়া অন্য কথা । সেজন্য দালালী করার দরকার হয় না, দরকার হয় না দেশের প্রতি বিশ্বসঘাতকতা করার । একজন নির্বিকার হয়ে আর সবার মতো তো থাকা যায়, যায় না ? বলতে, না যায় না । জলে বাস করে কুমিরের সাথে বিবাদ মানায় না । তাই বুঝি কুমিরকে পেটভরাবার জন্য আগবাড়িয়ে যাবার যোগান দিচ্ছ ? তাদের কাজ এগিয়ে দিচ্ছে ভালো মানুষদের নাম জোগাড় করে দিয়ে ? রেগে গিয়ে বলতে যা বোঝ না তা নিয়ে কথা গেলো না । আমরাই দেশের কাজ করছি, আমরাই ঈমানের কাজ করছি । ঈমানের কাজ করা তোমার বেড়ে গিয়েছিলো । তুমি দাড়ি রাখলে, তুমি সারাক্ষন টুপী গড়া ধরলে, হাতেও তসবী ঝুলানে রাতদিন, নামে মুন্সি ছিলে এবারে একেবারে মুন্সিজি হয়ে গিয়েছিলে । অবশ্য সে সময়ে তোমার কদর খুব বেড়েছিলো এটা ঠিক । যে সব বাড়ীর ছেলেরা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য বাড়ী ছেড়ে গিয়েছিল, গ্রামের সেই সব বাড়ী থেকে মুরুব্বীরা আসতো তোমার কাছে । তারা খুব ভয়ে ওয়ে তোমার কাছে আসতো। তোমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসতো, নগদ টাকা থেকে শুরু করে গাছের ফলাটা মুলাটা পর্যন্ত। তোমার কাছে তাদের একটাই আব্দার ছিলো, তাদের ছেলে যে মুক্তি হতে গেছে সে খবর যেন মিলিটারীদের কাছে অজানা থাকে। কেন যে তারা তোমার কাছে আসতো বুঝতাম না, কেন তোমারকে নজরে থাকতে চাইতো বুঝতাম না, ভীষন রকম নির্বোধ আর বোকা না হলে কেউ কি শিয়ালের কাছে মুরগী জোগান রাখতে দেয় ? তারা ভাবতো তোমার মিলিটারীদের ওখানে সকাল সন্ধা ওঠাবসা। তোমার নেক নজরে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু তুমি ওখানে ওঠাবসা করো বলেই যে বরং বলে দিতে পার সে চিন্তাটুকু তাদের হয়নি। তোমার কাছে না এলেই বরং মিলিটারীদের কষ্ট হতো খুঁজে বের করতে তা তারা বোঝে নি । আজকে কেন এতো কাঁদছে মুন্সিজি ? এতো কান্নাতো তোমাকে মানায় না । তোমার মতো গণ্ডায় ডুব দিয়ে কাদা ধুয়ে ফেনা লোকের এতো ভয় কেন ? তোমার কি কোন ধোয়া মোছার বাকী আছে এখনও ? এই এই আঠারো বছরে একবারও তো ক্ষমা চাওনি । একি তোমার সত্যিকারের অনুতাপ নাকি মৃত্যুর ভয়, নাকি মৃত্যুপরবর্তী আযাবের ভয় ? এই আঠারো বছরে একের পর এক জেদই করে গেছ। তোমার ঘরে যখন থেকে আর ঘিন্নায় যাইনি তখন তুমি আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নতুন বউ বিয়ে করে এনেছ । তাকে নিয়ে দিনে দুপুরে খিল দিয়েছ বুড়ো বয়সে । দাড়ির নিচ দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমার দিকেতাকিয়ে থেকেছ ইতরের মতো । কিন্তু তুমি কি এমনী ইতর ছিলে, আগেও ? প্রথম দশবছর সংসারের সময় বুঝিনি, হয়ত বুঝতামও না। যুদ্ধ তোমাকে বদলে দিল, বদলে দিল তোমার চাল চলন আচড়ন । তুমি ইতর শ্রেণীর মধ্যে হয়ে গেলে । তুমি আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ছেলেকে কষ্ট দিতে । ওকে ছেড়া জামায় রাখতে শীতে কষ্ট দিতে যতখন না সে কিছু চাইতো কিনে দিতে না । কারণ আমি আর আমার ছেলে তোমার কাছে কিছু চাইতাম না, চাই নি এই আঠারো বছর ধরে । তবে, ছেলে কলেজে যাবার পর টাকা চেয়ে চিঠি লিখতো তোমার কাছে । তুমিও গুনে গুনে পাঠাতে, যদিও জানতে ছেলে তোমার অপচয় করতে শেখেনি । সে ছোটতে লজ্জা মরে যেতো রাজাকারের ছেলে বলে । সেই নজ্জায় সে সংকুচিত হয়ে রইলো চিরকাল । পিতার কারণে পুত্রের সজ্জা কিন্তু‘ পিতা দিব্যি কাকের মতো ঠোঁট মুছে নিলো । তুমি এখন হাত জোড় করতে চাইছো যখন তোমার আর হাত জোড় করবার উপায় নাই । যখন তুমি ক্ষমার কথা উচ্চারণ করছ, তখন তোমার উচ্চারণ গেছে অস্পষ্ট হয়ে । আজ এমন ভিখিরির মতো করছ কেন ? তোমার এই রুপটা দেখার জজ্যই বোধহয় এতোদিন বেঁচে রয়েছি । অপেক্ষা করে থাকতে হলো আঠারো বছর, তাও অপরাধবোধ তোমার মধ্যে জাগতো কিনা কে জানে। আজ মৃত্যুর মুখো— মুখি এসে তবে । এখন কেন মখে শুধু বড়বউ বড়বউ শধু আজাহার আজাহার । মাত্র সাতবছর বয়স থেকে সে তার বাবার সরূপ চিনতে পেয়েছে । আমিই পারছি না, জানিনা ছেলে তোমাকে ক্ষমা করতে পারবে কিনা। এসে বলতে, প্রায়ই বলতে, মেজর সাহেব তোমার রান্নার প্রসংশা করেছে । খাওয়ার সময় বলেছে বহুত উমদা । তুমি বিগনিত হয়ে পরদিন আর বেশী করে ঘি দিয়ে রাঁধতে বলেছ আমাকে । এখন আফসোস হয়, কেন যে একদিন বিষ মিশাইনি ? ধরা পড়ে সবাই মিলে মরতাম, এর বেশী আর কি হতো ? এমনিই কি বেঁচে আছি নাকি । একদিন এসে বললে মেজর সাহেবের বাঙানী খানা খুব পছন্দ। সে চাউল পছন্দ করে । তুমি তাকে দাওয়াত দিয়ে এসে বললে ভুনা খিচুড়ি রাঁধতে, আর হাসের মাংসের কষা কষা ঝোল । বলেছিলাম, করে দেই, নিয়ে যাও। তুমি বললে, দাওয়াত করে এসেছি, নিয়ে গিয়ে খাওয়ালে অভদ্রতা হবে । এই একদিনই— আর ডাকবো না । কিন্তু তোমার কথার ঠিক ছিলো না। তুমি বার বার তাকে বাড়ীতে নিয়ে এসেছো । বাড়ীতে নিজে নিয়ে এসেছ নাকি বাধ্য হয়েছ সেটা শুনতে চাইনা তবে এনেছ যে এটাই তো কথা । সব বাড়ীতেতো তারা যায়নি, যেতে সাহসও পায়নি । সেই সেদিন, এক বর্ষাকালের সন্ধায় বাড়ীর সামনে জীপ এলো, মেজর সাহেব এলেন । তুমি বদনা হাতে যাচ্ছিলে, ফেলে ছুটে গেলে তিনি সেদিন হঠাৎ এসেছিলেন খুব দ্রুক্ষ হাতে সুজি আর চা করার পর রান্না সারতে হলো । গৃহস্থবাড়ীতে খোপে থাকা মুর্গির অভাব হয় না, সন্ধ্যাপর তাই ধরে জবো করে দিলে তুমি আর ছিলো ডিম, আলু ডিম আর মুর্গিতে চমৎকার ভোজ হলো তোমাদের । এদিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তুমি বললে তোমরা তাস খেলবে বৈঠক ঘরে বসে । কিছু পান সাজিয়ে দিলে তুমি নিয়ে গেলে আর বললে তুমি শুয়ে পড় । তাস খেলা কখন শেষ হবে, কখন মেজর সাহেব যাবেন বলা যায় না । তুমি চলে গেলে আজাহারকে পাশে নিয়ে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম । হঠাৎ আহাজারের মা মা ডাকে জেগে দেখি তুমি ততক্ষনে আজাহারকে কোলে নিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে গেছো, ওর মুখে হাত চাপা দিয়েছ জোরে,। আঁচল তুলে নিয়ে কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই দেখি দরজার বাইরে থেকে শিকল তোলার শব্দ। আর আজহারের কান্নাটা মুখ চাপা গোঙ্গানী শব্দটা ক্রমসই দূরে বৈঠক ঘরের দিকে যাচ্ছে । প্রথমেই দরজায় ছুটে গেলাম, জানি বন্ধ তবুও দাক্কা দিলাম জোরো জোরে, আর চিৎকার দিয়ে উঠলাম হাড়িকেনের আলোটাকে আরাল করে ঘরের মধ্যেই মেজর সাহেবকে বসা দেখে । ততক্ষনে বৃষ্টিও জোরে নেমেছে । আমার কান্না, মাথাঘুড়া, আহাজারি, সব, আরও সব সব কিছু ছাপিয়ে বৃষ্টি নেমে চলো ঝমঝম ঝম ঝুম। নিত্যদিনের মতই সকাল এলো, গড়িয়ে গেলো মাস, বছর, তারপর এই আঠারো বছর পর তুমি আজ ক্ষমা চাইতে বসেছ । বোধহয় ক্ষমা করবো বলেই সেই রাতের পর আত্ম হত্যা না করে বেঁচে রয়েছি । কড় কড় কড়াৎ করে পচন্ড একটা শব্দ হয় । বড়বউ দৌড়ে জানালার কাছে যায় । দেখে সরকার বাড়ীর গাছটা ক্রমশঃ হেলে পড়ছে মাটিতে। আমরা লাশ নিয়ে তখন অতি দ্রুত বাইরে যাচ্ছি একে একে । কি যেন কে জেনে ফেলে । নৌকায় লাশতুলে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হলো তারপর চরের বালুতে লাইন করে শোয়ানো হলো। মুসুল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে তখন । বাবাও আমাদের সাথেই ছিলো, বোধহয় ফিরতে বেশ দেরীই হয়েছিলো এসে দেখি উঠানে এই সুনিতা নাই। ভাবলাম ঘরে গিয়ে শুয়েছে । সকাল হলেও অন্ধকার ছাড়েনি বৃষ্টি হচ্ছে বলে । কিন্তু সুনিতা ঘরের নেই, গুকে কোথাওই পেলাম না। এ নিয়ে হৈ চৈ ও করতে পারলাম না আমরা বরং পরদিন জনতার সাথে ছাতা মাথায় আমরা, বাবা আর আমি তিনজনের লাশ দেখতে গেলাম দুই মাইল উজানে । ওদের গলায় গলা মিলিয়ে সুরে সুর মিলিয়ে কতোকথা বললাম । কিন্তু আমার গলায় কাঁটা বিধে রইলো, সে কাঁটা আজও খুলতে পারলাম না । সুনীতাকে আজও পেলাম না।
Read Also :-
Labels : #আফাজ মুন্সির কড় চা ,
Getting Info...

Post a Comment