হারানো বনে

হারানো বনে

হারানো বনে


harano bone

কি ভাবতে পেরেছিল?তা যে সে শ্যামলী কলেজের সে সময়ের সেরা মেয়েটি আজ একা একা ছোট্ট এ কটা ঘরে চুপচাপ প্রহর গুনে।কাঠের ঘর হলে বুঝি রাত দিন শুয়ে শুয়ে তাই গুন্ত।নির্লিপ্ত চোখে জানালা দিকে তাকিয়ে থাকে শ্যামলী।কাছেই পেয়ারা গাছের ডালে কত পাখি আসে বসে যায়।কখনও কূজনে মুখর হয়, কখনো একটু একটু করে টুকরি এ টু করিয়ে পেয়ারা খাওয়া দেখে পাখিদের।কী চমৎকার ছোট্ট পায়ে নখ দিয়ে ডাল কে আঁকড়ে রেখে শরীরটা সম্পূর্ণ ঝুলিয়ে দিয়ে নিজের থেকে খেতে পারে ওরা।জোরে একটানিঃশ্বাস নেয় শ্যামলী।তবু যেন ফুসফুস ভ রে বাতাস পায় না সে।আজকাল এই ছোট্ট ঘরটাকেই বড় আপন মনে হয় শ্যামলীর।নিজের এই ঘরটা মাটির বড়ো কাছাকাছি।জানালাপাশ দিয়ে সারি দিয়ে কালো কচুর গাছ।মোটামুটি স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।মাঝে মধ্যে তাঁর ঢালা ঢালা পাতাগুলো দুল না একটু একটুদেখে শ্যামলীর বাবার কথা মনে পড়ে যায়।কেন অভিমানে বাবা তার সাথে কথা বলতে চায় না। তবু একটু আধটু বলে নিতান্ত সান্ত্বনায়।গাছগুলো বাবার লাগানো বেড়ে বেড়ে এখন চমৎকার ঝরে।বলতেন কালোকচু চোখের জন্য দরকার বলতেন। রোজ রোজ কালোকচু খাইয়ে ছেলেমেয়েকে কালো করে ফেলি আর কি।মেয়ে তো আবার এমনিতেই শ্যামলা।মা আর সে সময় বাবার উপর রেগে আরো এ কটা কথা বলতেন।তা সে কথা মনে পড়ার মৃদু একটু হাসি এল শ্যামলীর। মা বলতেন।যাও বা মেয়েকে ফর্সা বলে চালানো যেত বিয়ের সময়।আবার আদিখ্যেতা করে নামিয়ে রেখে দিলেন শ্যামলী।যাতে অন্ধ বুঝে যে মেয়েটার গায়ের রং কী?বাবা হাসতেন,বলতেন,মেয়ের বিয়ের জন্য আমাকে ভাবতে হবে না।আমার মেয়ে আমি ভাবব তুমি নিশ্চিন্তে কচু শাক খাওয়াতে পারো।আবারও বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস টানতে যায় শ্যামলী।কিন্তু নিঃশ্বাসটা মাঝপথে কেঁপে কেঁপে ভেঙে ভেঙে যায়।এমন কেন হয়?কী নিজের জীবনের কথা ভেবে?নাকি বাবা স্মৃতির কারণে?নাকি তেমন করে আর কখনও কচু শাক খাওয়া হয় না বলে।শ্যামলী ঠিক মতো বুঝতে পারে না।হয়তো বুঝতে চাইও না।কী হবে ভেবে কী লাভ?এমন কী কেউ আছে যাকে সে সব কথা বলতে পারে।তা সে মুখরিত শ্যামলী খাওয়ার টেবিলে বাবার পক্ষ হয়ে ঝড় তুলল একদিন স্বাদ না দেখলে।বসে ভরিয়ে দিত শাক রান্নার প্রশংসায়।একেক দিন একেক রকম হয়। চিংড়ি দিয়ে নয়, ইলিশের মাথা কাটা নয়। শুধু কালোজিরা,মন দিয়ে নয়তো শুধু পাতার ভর্তা নয়তো পাতায় জড়ানো সর্ষে পেঁয়াজ।কী অপূর্ব যে।সব খাওয়া গুলো স্মৃতি।এখন টেবিলে ভুলেও কচু শাক আসে না।মনেও পড়ে না কারও।মা বড়ো বৃদ্ধিতে আর স্বামীহারা একাকীত্বে।প্রিয় মান চুপচাপ।শুধু সাগর টা বাসায় ফিরলে যা একটু শব্দ টোপ দেওয়া হয়।একটু হাঁকডাক করে,তার জোরে চলে ফিরে।উপরে উঠবার পথে আপা বলে একবার হাত হাঁক দেয়।মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞাসা করে কেমন আছ আপা ভিতরে আসব।তখন দু চোখ ফেটে কান্না আসে শ্যামলীর।তা।যে ভাইটাকে সে ভাল করে দেখবার বা সিন বা সময়টুকু পর্যন্ত পায়নি৷।সেই এখন তাঁর আর মার একাকী তাকে  মুখর করে।শ্যামলী কান্না হাসি মেশানো কি এ গলায় বলে।কী যে বলি সাগর?তুই বড় আপার ঘরে আসবি তাতে আবার জিজ্ঞাসা কী রে?আয় না ভাই আয়।সাগর বলে না বাবা না।তোমরা বিদেশে কাটানো মানুষ,এ সব ব্যাপারে তোমরা  খুব ফর্মলি জানি তাই। ওখানে তো শুনেছি।ভাই ভাইয়ের ঘরে বোন বোনের ঘরে,এমনকী স্বামীও নাকি স্ত্রীর ঘরে ঢুকতে পারমিশন নিয়ে ঢুকে।শ্যামলী আবারও একটা নিঃশ্বাস টানে।বলে তা অবশ্য তাই।কিন্তু আমি তো এখন এখানেই।সাগর ঘরে ঢুকে বলে।আজ কেমন আছো আপা,বুকে কি এখনও তেমন ব্যথা।একটু বাইরে হেঁটে চলে বেড়ালে কী ভাল লাগত না,চলো না। এবার ক্রিসেন্ট লেক থেকে বেরিয়ে আসি।তার পরে শহীদ সরণি,খুব সুন্দর চোরা রাস্তাটা আর এই কোটা সুন্দর ফোয়ারা হয়েছে ও মাথায়।যেন রক্ত বিধ ত বাংলাদেশ।বাংলাদেশে সব রকম ছবি আর সেখান থেকেই স্বচ্ছ পানি। তারপর ক্রমশ রক্ত হয়ে নেমে যাচ্ছে।চলো না আপা তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।বেশিক্ষণ লাগবে না।এ কটা রিকশাতেই বসে বসে ঘুরে দেখে আসব।শ্যামলীর দুই চোখ পানিতে ভরে যায়।বলে,আজ থাক লক্ষ্মী ভাইটি।আর একটু সুস্থ হই তখন যাব।তোর সাথেই তো যাব নইলে আর কে নিয়ে যাবে বল।ঠিক আছে,বলে ওপরে উঠে যায় সাগর,শ্যামলী ভাবে হায়রে মমতা এই দেশে। কত ছোট একটা ভাই তার বয়সে দিনেরও বেশি একটা বোনকে সাথে করে বেড়াতে যেতে চাইছে।ওখানে তার নিজের ছেলেমেয়েও যদি এমন একটু করত।দিনে অন্তত একবারও যদি বলত মা কেমন আছো?কী করলে আজ সারাদিন।এরকম কথা ওঁরা বলতে শেখেনি।শেখে না বোধহয় কেউই।শ্যামলী নিজের অতীতটা হাত রায় বারবার।কতটুকু ভুল তার ছিল,আছে কিংবা করছি এখন।শ্যামলীর যখন দুর্দান্ত জীবন।আর আনন্দ প্রতিভা ও যৌবন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তখন এই ছোট্ট ভাই সাগর আসে তাদের সংসারে।শেষ বয়সে সন্তান নিয়ে মা বোধহয় একটু লজ্জিত বিবৃত ছিলেন।কিন্তু বাবা খুব সত্যি কথাটা যেন বলতেন তখন।বলতেন,তুমি বুঝছো না,এই ছেলেই তোমার বেশি কাজে আসবে।তোমার বার্ধক্য তুমি শুধুমাত্র একেই কাছে পাবে।বৌ ছেলেরা ইউনিভার্সিটির প্রায় শেষ ধাপে মেয়ে কলেজের ওরাতোমাকে প্রায় সারলো বলে।তোমার সময় কাটানো বা আদর সোহাগ সব এর মধ্যেই টিকে থাকবে।কবছর এর মধ্যে বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। ভাই উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ আর মেজো ভাই সিএ।পড়তে পড়তে চাকরি পেয়ে বোসের মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হয়ে উঠে পড়ল।শ্যামলী নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত যে মা বাবাকে দেখবার তাঁর সময় হয় না এখন।দুরন্ত প্রাণবন্ত প্রতিভা নিয়ে শ্যামলী নাচের গায়ে খেলে বেড়ায় কলেজে বিতর্কে অংশ নেয় আবৃত্তি করে।সব কিছু নিয়ে সে এক মত্ত অবস্থা।আর আশ্চর্য শ্যামলী যাই করে সব কিছুতেই চমৎকার উত্তরে যায়।প্রচুর করতালি পায়,অনেকেরই মুগ্ধ দৃষ্টি শ্যামলকে ছুঁয়ে যায়।শ্যামলী তখন ব্যস্ত ভীষণ ব্যস্ত।মনেপরে মাঝে মাঝে ছোটএই সাগরের গলাটা চিপে ধরে কাঁদতেন হয়ত গালে জুড়ে চুমু দিয়ে একেবারে লাল করে দিতে।না বকতেন বলতেন এটা এ কটা আদরের ধরন হল।মার আর কিছু বলবার সময় ছিল না।সংসার আর অসময়ের ছেলেটার দুরন্তপনা নিয়ে।শুধু বাবাই মাঝে মাঝে শ্যামলীকে ডেকে কাছে বসাত।মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো?একটু আস্তে চলো মা,আস্তে চললে হুঁচট খাবার,পিছলে পরার , উল্টে পরবার মানে কোনরকম পরে যাওয়ার ভয় নেই বুঝলি।বাবা যখন কথা বলত।শুনতে যে খুব খারাপ লাগত শ্যামলী ঠিক তা নয়,কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক চঞ্চলতার মধ্যে একটু উঠি উঠি ভাব থাকে।মন তখন বলত,বাবা তুমি কিচ্ছু বোঝো না।আস্তে চললে যে আমি সবার চেয়ে পিছিয়ে পড়ব সেটা তো তুমি বুঝছো না।মুখে বলত বাবা,কালকে কবিতা আবৃত্তি আছে। একবার শুনবে?শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।কাল সারারাত অতিশয় স্বপ্নে স্বপ্নে।বিদ্যুৎ চমকে জাগিয়ে রেখেছিল আমায় পুরান সাত,শ্যামলী বলে সেতে থাকত। আর বাবা আশ্চর্য দুখ তুলে তাকাতেন।বলতেন তোরা এসব কি কবিতা বলিস বুঝি না,এগুলো আবৃত্তি করতে পারিস না।তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ।ক্ষমা করো হজরত।ভুলিয়া গিয়াছি তোমার আদর্শ।তোমার দেখানো পথ।ক্ষমা কর হজরত। শ্যামলী বলত সব বড্ড সেকেলে বাবা।আর সে আমলের বাবার কথায় বার বারমনে হচ্ছে।সত্যিই কি ধীরে চললে সে এই হুজুগটা খেত না।পিছলে পড়ত না। বাবা উল্টা তো না।হয়তো তাই হয়তোবা না।এও তো শুনেছে ভাগ্যকে পরিহার করা যায় না।শ্যামলী অতি সাধারণ অথচ একটুও অন্যান্য তার সবকিছু মিলিয়ে।আর।ওইটুকু দিয়ে সে হয় করেছিল সে সময়ের কলেজের সেরা ছেলেটিকে।কতটুকু সেরা? সে হিসেবে অবশ্য তখন তাদের মাপে কাঠিতে এক মাত্র এই ক টা ছেলে নিজে গাড়ি চালিয়ে কলেজে আসত,ফিটফাট,বেশবাস,সুলে নতুন ফ্যাশনের কার্ড।চমৎকার ব্শেফ যেন কিশোর বালক। আর ধামি লোশনের গন্ধ ছড়ানো ফিরোজ।ফিরোজ তখন সব এর সব ছাত্রীদের তপস্যা।আর ধন যে।ফিরোজতখন বি এস সি দিচ্ছে,আর ওরা মাত্র প্রথম বর্ষে ভর্তি হই।এদের আফসোস কেন ক্লাসমেট হলাম না তাহলেঅনেক সময়ের সাথে কাটানো যেত।শ্যামলী যে কী করে,সেই ফিরোজের দৃষ্টিতে পড়ল সেও এক আশ্চর্য ব্যাপার।কয়েক জনবিলাতি ছেলে মেয়ে কলেজে এসেছিল,পড়াশোনা মানে থিসিস এর কারণে কী সব ডেটা ফেটা নিতে?প্রিন্সিপাল সাহেব ডেকেছিলেন প্রত্যেক ইয়ারের দুই একজন করে।তার মধ্যে শ্যামলী একজন।আর তাতে ফিরুজ যে থাকবে সে।তো নিশ্চিত।কারণ সারা কলেজে কোনও ছাত্র ওই অত ভাল ইংরেজি জানে না।ফিরোজের বাবা মিলের ম্যানেজার।ওরা বছরে বেশ কবার বাইরে যায়।ঘরে বিদেশি টিসার কথা বলা শিখায় ইত্যাদি।কথা কলেজ ময় আলোচিত হত।ওঁর প্রতিটা চলাফেরা যুবকেরা ঈর্ষান্বিত হত আবার গোপনে নকলকরতোসমালোচনায় মুখর হয়।সেই ছেলেমেয়ের দলটি সারা কলেজময় গু ছিল।তা লাইব্রেরি ক্লাসরুম থেকে কমন রুম পর্যন্ত সর্বোত্তম।কথাবার্তা সব ফিরোজি বলেছিল।অন্যরা শুধু পাশে থাকা এই আর কি? মেয়েদের কমন।রুমের কাছে এসে থমকালো।বলল, এখানে শুধু মেয়েরা যাবো আমাদের জন্য নিষেধ।ওরা অবাক হয়ে তাকাল।ফিরোজ তখন বলল।তোমরা ডিজিটাল।আর তাই তোমরা সবাই যেতে পারো।আর এই শ্যামলই তোমাদের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে।চমকে তাকায় শ্যামলী দুই কারণে।মত বিদেশি গুলোকে সে সাথে করে নিয়ে যাবে।যদিও মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কমন রুম দেখানো হয়ে যাবে। তবুও এইটুকু সময়ই বা সে কী কথা বলবে ওদের সাথে।সে যতই চঞ্চল হোক গান করুককিন্তু একটাইংরেজিও তাঁর মুখ দিয়ে বের হবে না।আর আশ্চর্য ফিরোজ কী?করে কথা বলল যে এই শ্যামলই তোমাদের নিয়ে যাবে।শ্যামলী পারবে কি না সেটা একবার জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করা নেই।কী নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করল শ্যামলীর নাম।ফিরোজ যাও শ্যামলী।ওদের নিয়ে যাও।দেখাওযে আমাদের মেয়েরা নিজেরা নিজেরা আলাদা হয়েই কেমন করে থাকে আর একা একাই খেলে।শুধু ইন্ডোর গেম এই দিব্যি চলে যায় ওদের।আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে ছিল শ্যামলী।ফিরোজ কি এই কথাগুলো গৌরব নিয়ে বলছে, নাকি তাঁকে খোঁচা দিয়ে বলছে।আর একথা এঁদের সে বোঝাতে যাবে কেন ,যে দেশে যেমন নিয়ম।শ্যামলীওদের নিয়ে ভিতরে গিয়েছিল।লুডু খেলার বিবরণ দিয়েছিল ভেঙে ভেঙে।সাপলুডু  ,ঘর লুডু,ক্যারাম,বাগা লড্ডু।এ কটাজিনিসের জন্য টেবিল রয়েছে। কিন্তু কেউ খেলছিল।পা ফাঁকা।ঘন্টা ঘোরানো হল বেশ তাড়াতাড়ি।আর ফিরতে ফিরতে।শ্যামলী তাঁর গেম এর অর্থ জিজ্ঞাসা করল।বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ফিরোজ।শ্যামলীর ই তো সত্যতা করা দেখে সেই প্রশ্নটা লুফে নিল। আর ।নির্লজ্জের মতো ওদের কাছে ব্যাখ্যা করতে লাগল শ্যামলীর অর্থ বললশ্যামলী অর্থ বাংলার রূপ,শ্যামলী অর্থ চিরসবুজ ,সুন্দর তণ্বী  এছাড়া বাঙালি মেয়ের সম্পূর্ণ প্রকাশ।তার দীঘল চুল তার,তাঁর ভয়ে চোখ তাঁর শ্যাম সিদ্ধ গায়ের রং।ফিরোজ যতক্ষণ ব্যাখ্যা করছিল ততক্ষণে সবাই শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যেন কথাগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিল।আর শেষে বলেছিল।অদ্ভুত তো,এই একটিমেয়েই তো বাঙালি মেয়ের উপমা হয়ে উঠতে পারে।আর ততক্ষণশ্যামলীর যে কী অবস্থা হয়েছিল তা শুধু শ্যামলী জানে।লজ্জায় লাল হয়ে বিম মই হয়ে মোটা লম্বা বেণী টা নিয়ে যেন নুয়ে পড়েছিল।বাংলায় বলতে হলে সে এতক্ষণ কিছু কথা শোনাতে পারত। কিন্তু তা হল না।সেই রূপ মিষ্টি হেসে হেসে উপভোগ করল সবাইআর বিশেষ করে ফিরোজ।সেই থেকে পরিচয়।পরে শ্যামলী একচোট নিয়েছিল।ফিরোজকে কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। বরং আরও জড়িয়ে ছিল তাতে।শ্যামলী মেয়েদের রাখতে নেই।তাতে বাঙালির নষ্ট হয়।শ্যামলী প্রায় কেঁদে ফেলেছিল।তখন ফিরোজ বলেছিল।এই তো চাই৷ এটাই তো শ্যামলীর আসল রূপ।বাঙালির কান্না ছাড়া আর কী আছে?বাংলা হাসতে ভুলে গেছে।শ্যামলী।আঁচলে চোখ মুছে বলেছিল।যান আপনার সাথে কথা নেই।।ফিরোজ বলেছিল, কথার সবে তো শুরু।এরপর সমস্ত কলেজক ঈর্ষান্বিত করে ওরা অনেক এসেছিল।বেরিয়েছিল,খেলেছিল,হুঁ আরে।আর বছর না ঘুরতেই উড়ে গিয়েছিল দু জন বিলেতে।মিল মালিক বাবা ফিরোজকে ব্যারিস্টার।করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল,আর শ্যামলীর বাবা সরকারি চাকুরে হিসেবে মনে সম্মানে খুব কম ছিল না।ফলে দুজনার বিয়েতে তেমন বাধা হয়নি।এবং ফিরোজের বাবার আগ্রহই ছিল বেশি।বোধহয় মনে মনে বিদেশ যাবার আগে জুড়ায় বেঁধে দেবার ইচ্ছা তাঁদের ছিল।শ্যামলী ভাল বরং  শ্রোতা দিনের পাল্লায় না পড়লে বাঁচেন।স্বপ্নের বিভোরতা এ কাঁচাবয়সের খাদ্তাআর বিলেতে টানে তারা হেসে তারা কল কল,গেয়ে সল সল একেবারে প্লেনের ডানায় যেন বসেছিল,সোলে গেল বিলেতে।ফিরোজেরবাবার বন্ধুদের সাহায্য সাহস মন্দ কাজ ছিল না।প্রথম দু বছর পরেও এগুলো এই ফাঁকে শ্যামলী ইংলিশ কোর্স করল এখানে ওখানে।তারপর কী যে হল ফিরোজকে বিলেতের হাওয়াই পেল।প্রথমে ঠান্ডা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একটু একটু ও বিয়ার হল।তারপর পড়াশোনার চেয়ে টাকাকে বেশি করে চিনল।কোনও এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সাথে সেরে ব্যবসায় নামল।ক্রমশ বাড়ির দিকে চিঠি লেখা কোমল।মালিক বাবা বোধ ভয় দুঃখে সুখেবোবা হয়ে গেলেন।আর কিছুই কোনওদিন লিখলেন না।ব্যবসা কেঁদে বসল।তার পর পশু টাকা আর তাঁর ব্যস্ত বিলাস জীবন শুরু হল।শ্যামলী প্রথম চার বছরের মাথায় একবার দেশে যাবে ঠিক করেছিল কিন্তু যায়নি।।বাছাহবে বলে ফিরোজ বাধা ছিল।কারণ বিলেতে জন্মানো বাচ্চার মর্যাদায় আলাদা।তার পর পাঁচ বছরের মাথায় বলেছিলপরে গ্রিন কার্ড হয়ে গেলেই যা ভাল যাতে দেশে গেলে ফিরবার আরে পথে আর কোনও ঝামেলা না হয়।ছ বছরের মাথায় আরেকটি মেয়ে আর এদেরকে নিয়েদ দশটি বছর কেটে গিয়েছিল দেশে না গিয়ে।তাঁদের থেকে অন্যরা প্রচণ্ড হিংসা করেছিল ওদের।কিন্তু শ্যামলী।জানি তো তাঁর দিন রাত কীভাবে কাটছে।জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব।একা একা নিজ হাতে।মাথা দৌড়লে পানিটুকু ও আর শিশিটা মল নিজে নেওয়া ছাড়া উপায় নাই।রান্না বাসন তরিতরকারি,কাপড়চোপড় ধোঁয়া আর শুকনো মেশিন থেকে বের করে স্ত্রী করা।ঘর পরিষ্কার করা ফিরোজের জুতাপালিশে সব মিলিয়ে হিম শিম অবস্থা।শ্যামলী নিজের নখে পালিশের কথা একদম ভুলে গেল।দরজায় কাছেই ঝুলে আছে সারি সারি রেনকোট।ওদের চারজনের, শ্যামলী প্রায় কোট গায়ে বাইরে যাচ্ছে।বাজার করতে কখনও হেঁটে, কখনও বাশেষ সপ্তাহে একবার নিজেদের গাড়িতে।ওটা ফিরোজের কাছে ব্যস্ত থাকে তবে সপ্তাহের শেষে যখন বের হয় তখন সে শ্যামলী ড্রাইভার করে নিয়ে যায়।কিন্তু।কোথায়, কত দূরে আর যাবে?প্রয়োজনেরকেনাকাটাতেই সময় ফুরিয়ে যায়।তা ছাড়া পার্কিং পাওয়ার বিরক্তিতে এর ওর গাড়ি চালাতে ভাল লাগে না।হাইড পার্কে যাবে সেখানেও বিশ্রী সব ব্যাপারস্যাপার মেয়ে দু টোকে সাথে নিয়ে যাওয়া যায় নাও সব জায়গায়।গোলাপ বাগানে রও একই অবস্থা।ছোট মেয়েরা গোলাপের সুবাস কিনে নেবে। বরং কাঁটার খাই বেশি লাগে।আর দূরে দূরে ক্যামিস্ট্রি অক্সফোর্ড যাওয়া চারটিখানি কথা নয়।তাছাড়া এসব বেড়ানোটা এড়ানোর ব্যাপারে ফিরোজের মনে আর কোনও আবেগ কাজ করে বলে মনে হয় না।বড়ই যান্ত্রিক জীবন।ভীষণ কনকনে ঠান্ডায় শ্যামলী মেয়েদুটোর টিউব ট্রেনেরউদ্দেশ্যে পাতালে যায়।স্কুলে আনা নেওয়া করে।কখনও বিকেলে গভীর রাতের অন্ধকারে আবার কখনও রাত্রে সূর‌্যের উজ্জ্বল আলো কে রাধে বা রে, বাঙালি মায়ের মতোই ইচ্ছা করেরূপকথার গল্প শুনিয়ে নয়তো গুনগুন গান দিয়ে ঘুম পাড়ায় ওদের।কিন্তু ফিরো সেটা পছন্দ করে না।বলে ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দাও।স্বাধীন ভাবে বড় হতে।মেয়েদুটোকে স্বাধীনতায় দিয়েছে ওরা সম্পূর্ণস্বাধীনতা।কী করে টেবিলে রোষ গরম গরম টোস্ট।ডিম।জ্যাম জেলি,মাখন,পানির সাথে আরও অনেক কিছু আসে তারা বুঝল না।মা কত রাত পর্যন্ত কাপ?ডিশ ধরে সকালের জন্য টেবিল গুছিয়ে ওয়াশ বেসিন আলোয় ধুয়ে উপরে উঠে শুতে যায়তা তারা জানল না।জন্ম নেন বিলেতে কিন্তু কায়দা জানো বাসায় হল বাঙালি।মা আদর করে প্লেটটা ধুতে না দিয়ে ওটা ওদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল।এটা হাতে শ্যামলী প্রায় মাঝরাতে গারবেজ ফেলে আসে।খুব সকালে প্রায় আধা মাইল হেঁটে যায় কলাবা আপেল আনতে কাছের গ্রোসারি তে,উঠেই ডিজাইনের সুইচটা অন করে যাতে উঠে মেয়েরা আর ফিরোজগোসলের জন্য হাত মুখ ধোয়ার জন্য গরম পানি পায় ঠিক মতো।কখন যেন অজান্তেই সমস্ত কাজই শ্যামলীর উপরে বর্তে গেছে একা একা।এরপর শ্যামলীরকয়েকটা কাছে হঠাৎ কমে গেলযখন মেয়েরা তাঁর একা একা পাতাল রেলের রাস্তায় আসা যাওয়া শিখে গেল।একটু বড় হল আর মায়ের যাওয়া পছন্দ না তাঁদের।তখন শ্যামলী ঘরে বসে ওদের জামা কাপড়ছেঁটেকেটে বানাত।সোয়েটার বন্ধু। নতুন নতুন।কিছুদিন পরে এ কাজটাও চলে গেল তাঁর।মেয়েরা ফ্যাশন মাফিক কেনা কাপড় পছন্দ করতে লাগল।মিসাইল ওদের অন্তত কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীত শেখায়।জীবনানন্দ দাশের কবিতা।জসীম উদ্দীনের কবর কবিতা।কিন্তু মেয়েরা তার কোনও মূল্যই বুঝল না।ঘরে বাইরে ইংরেজিতে ফিরোজ বরং আনন্দিত হল।বলল, ওদেরই সার্থক জীবন।মেয়েরা বাবাকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিত।আমি তখন হুঁশে ললিতে ফকির পানি গরম করত।শ্যামলীর বোধহয় এক বারোই ইচ্ছে হতো না দীঘল চুল এসে ব্রাশ বুলিয়েছে কিনা? মনে করত।দু তিনদিন পর পর চুল ভেজাল ও ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাতে হবে ভেবে তাঁর আর ভাল লাগত না।ও তখন অত লম্বা চুলঅন্যের সাহায্য ছাড়া শুকানো কঠিন।মেয়েরা বলত।কী যে বোঝা রাখো মাথায়।কেটেছোট ফেললেই পারো।মেয়েদের একজনের ভিউ কার্ডআর একজনের ইউ।ওরা কখনও দিঘল বেণির কবিতা শোনেনি। গান ও গায়নি।হঠাৎ শ্যামলীর তাঁর মনটা একদিন দুলে উঠল এই চুল প্রসঙ্গে।ঢাকা ঢাকা ছায়া ছায়া পর্দাটা ক্রমশ সরে যেতে স্মৃতিতে।উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন গত জীবনের দুর্লভ এক মুহূর্ততখন সবে ভর্তি হয়েছে কলেজে।চুল ভেজা ছিল বলে সে এলো চুলে কলেজে যা ছিল।ঘাড়ে সাথে জুড়ে ছিল শান্তিনিকেতনি ব্যাগ।পরনে সাদা শাড়ি, লাল পাড়।পিছনে থেকে গম্ভীর সিদ্ধ মিষ্টি যেএ কটাকবিতা সে শুনেছিল খুব ধীর শান্ত গলায়।চুলগুলো সু খাবেবলে সে অর্ধেক সামনেও অর্ধেক পিঠের উপরে রেখেছিল।।কবিতার লাইনগুলো খুব স্পষ্ট ও ধীরে ধীরে , উচ্চারিতহয়েছিল।পিছন থেকে দেখিল কোমল গ্রীবা।লোভন হয়েছে রেশম চিকুর চুলে।কবিতা শোনার পর।প্রথমত গ্রীবায় ফিরে তাকিয়ে ছিল শ্যামলী।ভেসেছিল রেগে ফুস করে উঠবে। কিন্তু তা আর হয়নি।পিছনে তাকিয়ে সে তাদের অতি প্রিয় বাংলা স্যারকে দেখতে পায়।স্যরের চোখে ছিল নির্মল এক আনন্দ আর শ্যামলী হয়েছি নত নম্র।এর পর বেশ ক বারস্যারের সাথে তার অন্তরঙ্গতা এ কেটেছে।সে অন্তরঙ্গতা, নির্মল মধুর।আবৃত্তির উচ্চারণের জন্য গানের বাণীর অর্থের সাথে ভাবে।জন্য রাখতে।ক্লাসেও কখনও কখনও ওদের ছেড়ে তাঁকে শুধু প্রশ্ন করেছেন স্যার।মেয়েরা ব্যাচেলর্স স্যারকেনিয়ে শ্যামলীকে একটু আট্টু টিপ নিত্য করেছে।শ্যামলী জানে না স্যারের মনে অন্য কিছু ছিল কি না।কিন্তু শ্যামলী অল্পদিনের মধ্যেই জড়িয়ে পড়েছিল ফিরোজের প্রবলকোথায়কিন্তু আজ কেন শ্যামলীর সেই স্যারের কথা মনে পড়ছে?স্যার এখন কোথায় কোন কলেজে আছেন?বোধহয় রিটায়ার টের প্রায় সময় হয়ে এলো।এই শ্যামলই তাঁর ছাত্রী হয়েই অবসর নিয়ে নিল জীবনে।আসলে মনে হওয়া উচিত ছিল সেই তখন যখন শ্যামলী রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা ক্রমশ ভুল ছিল।যখন শ্যামলী কবিতার উচ্চারণ নিয়ে কখনই এতটুকু সময় দেয়নি।যখন সে এমনই তার বিলেতে।ক্রিস চলতে সাধু বাগানের ধরনের পাতায় খুন্তি দিয়ে খুঁটিয়ে মাটি নরম করত।ধনে পাতা দিয়ে লাউ ঘাট ওরা কেউ খেত না।ফলে শ্যামলী একার জন্য করেননি কখনও।বাঁশ পাতামাছের শরীরের আস্বাদ বোঝেনি।?ও ওদের সাথে।স্যান্ডউইচ সেই কামড় দিয়েছে। দিয়েছে কালো কফিতে চমক।তখন একবারও পিছন ফিরে তাকানো হয়নি নিজের দিকে।নিজের গুণ মুগ্ধদের দিকে।এই ফিরোজের প্লাবনেই বড্ড দিশেহারা হয়েছিল শ্যামলী।যখন সে ভাব কাটল।তখন আর পায়ের তলে সে শক্ত মাটি খুঁজে পেল না।বড় ভাইয়েরা কোনও খোঁজ রাখেনি শ্যামলীর।আসলে সবাই ব্যস্ত সে তাঁদের দোষ ও দেয় না তেমন। বাবার মৃত্যুর খবরটা দিয়েছিল এই সবচেয়ে ছোট ভাইটি সাগর।সেও আজ ক বছর হল বেশ ক বছর।শ্যামলী হিসেব করতে করতে।সাগর লিখেছে শ্যামা আপু,বাবা চলে গেছেন। এখন শুধু মা আর আমি।কী ছিল এই কথাটুকু তে?শ্যামা আপু সমন্ধে শ্যামলী সেইদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।বহুদিন পর সে কেঁদেছিল।বাবার জন্য মায়ের জন্য তার ছোট ভাই টার জন্য।তাঁর দেশের জন্য।বেসন কষ্ট পেয়েছিল সেদিন শ্যামলী।ভেবেছিল ফিরোজ ফিরে এলে অন্তত একটু সান্ত্বনা পাবে।মেয়েরা ফিলে ওদের আদর পেয়ে ব্যথা ভুলবে।ঠিক উল্টোটি হয়েছিল।ফিরোজ ফিরে এসে বলেছিল।তো আমি এখনও এত  সেন্টিমেন্টালরয়ে গেছো।এত দিনে এতটুকু শেখোনি যে অন্য কেচোখের পানি দেখানোটা এখানে লজ্জার ব্যাপার।মনের ভাবঅন্যকে বুঝতে দেয়াটা অশিক্ষিত লক্ষণ।আর মেয়েরা ফিরে এসে মাকে এব্যাপারে কোনও প্রশ্নই করেনি।শিখেছে কারও ব্যক্তিগত সুখ বা দুঃখের অযথা উৎসুক দেখা দেয়নি।শ্যামলীর কান্না শুকিয়ে গিয়েছিল একা একাই।বারবার মনে হয়েছিল ফিরোজআর তাঁর নিজের রক্তের মেয়েরা আজ অন্য মানুষ হয়ে গেল।।এদের কাছে হাসিকান্নার আর কোনও অর্থই নেই।শুধু গতিময় চলমান জীবন এদের সামনে।তারপরও অনেক সময় গড়িয়ে গেছে।শ্যামলীর ভাববার সময় ছিল অনেক কিন্তু ভাবা হয়নি।মেয়ে দুটিনিয়ে ভাবতে ভাবতে তাঁর সময়গুলো বছরের পর বছর পার হয়ে গেছে।ব্যবসায় উন্নতির সাথে সাথে ফিরোজ অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বাড়ি কিনেছে।তিনতলা কাঠের বাড়ি রান্না খাওয়া বসা ও গ্যারেজ।মাঝে মেয়েদের আলাদা আলাদা ও গেস্ট আর উপরে তাঁদের দুজনের দুইটিসারা বাড়ি।সিঁড়ি আর ঘরময় কার্পেটে মোড়ানো।সকালে নাস্তার পর সবাই বের হয়ে গেলে শ্যামলী সারা বাড়িবে কম করছে।কাপড় বেছে নিয়ে হাতে কলার ও কাফ পরিষ্কার করে তবে ওয়াশিং মেশিনে দিয়েছে।একা একা এনে ছেড়ে দিয়েছে আর অপেক্ষা করছেওদের বাড়ি ফিরবার এদিকে তাঁর সময় একটু অপেক্ষা করে থাকেনি পেরিয়ে গেছে।।মাস বছর যুগ তরতর করে।বড় মেয়েটা একদিন ফিরে এল না।ফিরোজ বলল।যুগের হাওয়া এখানকার হাওয়া মেনে নিতে হবে।দুই দিন পরে ফোন এল সে আমেরিকায় তাঁর বন্ধুর সাথে।এখন ওরা ওখানেই থাকবে।তার জন্য না ভাবতে।সে সময় পেলে পরে আবার কথা বলবে।শ্যামলী দুঃখিত হওয়ার যে যেন বিস্মিতই হয়েছে বেশি।হায় রে বাঙালি মায়ের বিলেতের মেয়ে।কিছু করবার ছিল ননা শ্যামলীর।ফিরোজ এ ভাবেই ওঁদের বাড়তে দিয়েছে।আর ছোট্ট মেয়েটা তো কথা ফোটার সময় থেকেই কিছু প্রকৃতির।মায়ের কাছে তাঁর অনুযোগের শেষ নেই।কম রাগ আর দুঃখ যে তার মা কালো বলেই তাঁকে কালো হতে হয়েছে।তাঁদের বড় মেয়ে হয়েছে ফিরোজের মতো ফর্সা আর বিলাতের হাওয়ায় সেটা এখন আরও ফর্সা হয়েছে।কিন্তুদ্বিতীয় জনের কথায় উত্তর দেব আর কিছুই নেই শ্যামলী।শ্যামলীর যে রং নিয়ে অন্যরা গর্ব করছেআজ মেয়েকাছে সেই রংটাই হয়েছে হীনমন্যতাতাঁর ঘৃণার কারণ।বোধ হয় এই কারণেই  কিংবা অন্য কোনও অজানা কারণে মেয়েটি শ্যামলীর সাথে কখনও তেমন স্বাভাবিক হয়নিআর সেও নিজে থেকে আগবাড়িয়ে কিছু বলেনি। দারুণ এক অভিমান।যদিও জানত বিমানের কোনও মূল্য সে পাবে না তবুও।বড় মেয়ে চলে যাওয়ার পর ছোটটা বাবার অনুমতি নিয়ে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে চলে গেল।অজুহাত একা একা পরতে ভালো লাগে না।তার বড় বোন ছাড়া এ বাড়িতে তাঁর থাকবার আর  আছে।।শ্যামলী যেন কেউ না।কিছুই না।তাঁর একাকিত্ব যেন কোনও ঘটনাই না।ছোট্ট মেয়েটাও চলে যাওয়ার পর কি যেন কি হলো শ্যামলী?উদাসীন চোখে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকত সারাদিন।সিন সি নিয়ে এ ক টা বুকের ব্যথা উঠত মাঝেমধ্যেই।গ্লাস গ্লাস শুধু পানি খেত।কাউকে কিছুবলতে ইচ্ছে করত না।আর বলবেই বা কাকে।ফিরোজ রোজ রোজ বাসায় ফেরে না।দুই স্যার দিন পর পর ফিরে বলে।কাজ করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। তখন আর ফিরে কী লাভ?সকালে তো আবার ছুটতে হবে।শ্যামলী মনে মনে বলে।কত ছুটি আর কী লাভ?আর কি দরকার আছে তাঁদের।মেয়েরা তো যে যার মতো চলে গেছে বলতে গেলে।মুখ ফুটে বলা হয় না।ব্যস্ত ফিরোজ আরও ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে যায়।কী যেন কোথায় যায়?আজকাল বড় বেশি বোধহয় মদ খাচ্ছে সে।কেমন যেন ঘোলাটে থাকে সারাক্ষণ।বড় মেয়ের চলে যাওয়া এ ব্যথা কী কাজ করে ফিরোজের মতো।কিংবা মেয়ের বাড়ি থাকতে হস্টেলে যে থাকা।নয়তো শ্যামলীর এই অনন্ত একাকিত্ব।শ্যামলীর মনে হয় এ সবের কোনও কিছুই ফিরোজের মনে কোনও দাগই কাটতে পারে না।যে ফিরোজ এই বিশ বছরে একবারও দেশে যাবার আগ্রহ মুখে দেখায়নি। অন্তত।শ্যামলী ভাবে সেই প্রাণ।বন্যায় ভরা ফিরোজ কী করে শুধু টাকার নেশায় মেতে রইল।কি করে কি করে?ছোট্ট মেয়েটা বাছা বাছা সময়ে কথা বলে যখন ফিরোজ বাসায় থাকে।আর আশ্চর্য শ্যামলীকে এবার চায় না পর্যন্ত।কী যেন কিছু জিজ্ঞাসা করে কি না?এই সব সময়ে শ্যামলীর বুকের ব্যাপারটা বাড়ে।হয় যেন পাল্ সের বিটগুলো এ গতিতে চলে না।থামতে থামতে আবার চলে।শ্যামলী বাঁ হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরে অন্য সুরে চলে যায়।চোখ করকর করে। কিন্তু সে কাঁদে না।এই কি হবে কে দে?শুধু বড় মেয়ের শেষ মাসান্তে ফোন করবে সেই আশায় দিন রাত গড়ায়।হয়তো শুধু দুমিনিট।মাত্র দুইটি কথা। তবু ওইটুকুর জন্যই যেন বেঁচে থাকা শ্যামল।আর একজন যেন বার বার পিছন থেকে ডাকে শ্যামা আপু বলে।যখন শ্যামলীবিলেত চলে এসেছিল তখন সাগরটা কতটুকু ছিল। তখন কি সাগর শ্যামা আপু বলে কখনও ডেকেছে।তাহলে এই ডাকটাও কে কে শিখিয়েছিল?বাবা নাকি মা?শ্যামা ডাকটা মনে হয় বাবাই শিখিয়েছে।আহা এবার কি যে এই ডাকটা সত্যি সত্যি শুনতে পেতে পারে না।শুধু এই ডাক্তার জন্যই যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল শ্যামলী।মলি বিশ বছর পর এলে সাগর জড়িয়ে ধরে বলল।শ্যামা আপু তুমি এত সুন্দর।আমার শ্যামা আপু আমার আপু।শ্যামা বুক ভেজালো কেঁদে। সাগর তা মুছিয়ে দিলো বার বাব,বড় মধুর বড় মধুর মনে হল শ্যামলী।এমন আদর যে কতদিন পাইনি?বাবা যেখানে বসে কাগজ পড়তো।ফাইল দেখত সেই ছোট্ট ঘরটায় ঢুকে শ্যামলী আরবের হল না বললেও সে এখানেই থাকবে,থাকলেও তাই,রয়েছেতাই,বুকেরচিনচিনে ব্যথাটা ভেবেছিলদেশে ফিরতে পারলে চলে যাবে কিন্তু গেল না আরঝাকিয়ে বসল। একটুতেই হাত ধরে যায়।ভীষণ রকম ঘামে, সাগর বলে, বিলেতে বহুকাল ঘামনিত তাই এমন হচ্ছে। মাঝেমাঝে মার কাছে যেয়ে বসে।অপরাধী লাগে নিজেকে।মা বাবার জন্য এ জীবনে তাঁর আর কিছুই করা হল না।চমকে নিজের দিকে ফিরে তাকায়।তাই কিসে নিজের মেয়েদের কাছে কিছুই পেলো না।মা বলেন।তা ফিরোজের কোন সি ঠিকানা এসেছে শ্যামলী।শ্যামলী মুখ নিচু করে থাকে।কী? জবাব দেবে সে।ওপেন টিকেট তো তাঁর কাছে আছে।কিন্তু কী জন্য যাবে সে ওখানে?কার কাছে আর কীসের আশায়?আর চিঠিতে কী খবরই বা তারা নেয়া দেয়া করবে?বলা যায় না। তবু মনে মনে মাকে বলে।জীবন ওখানে বড় তাড়াতাড়ি সুখায় মাতাড়াতাড়ি।সব কিছু শেষ হয়ে যায়।তবু মা কে সান্ত্বনা দিয়ে বলে শ্যামলী। ফিরোজতো?জানতে চায় কত তাড়াতাড়ি যাব বলছি। বিশ বছর পরে এলাম এখনই আবার মা বলেন, সে তোর ইচ্ছে।শ্যামল ও তার ইশা টাকেও যাচাই করে দেখতে চায়।ইচ্ছে করে সেই বাংলার সার।তাঁর খোঁজ নিতে।ইচ্ছে করে ছোট ভাইটাকে সাথে নিয়ে।ক্রিসেন্ট লেকের কৃষ্ণচূড়ায় তলায় পাপড়ি কুড়াতে কুড়াতে আঁচল ভরিয়ে ফেলতে।ইচ্ছে করে আর এবার জীবনকে ফিরে পেয়ে প্রাণ বন্যায় ভরে তুলতে।তাই খাঁচার বন্দি পাখি হয়ে নয় মুক্ত হয়ে গান গেয়ে গেয়ে ফিরতে।স্মৃতির ভারে চিন চিন করে ওঠে বুক।স্থানে শুধুই যেন হলাহল ও উঠে আসে।শিশির নীচ থেকে বুক চেপে ধরে।চিৎকার করে বলে সাগর।আমাকে একটু বাতাস এ নিয়ে যাবে।
Read Also :-
Labels : #Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#হারানো বনে ,
Getting Info...

Post a Comment