একটা চিঠি

”একটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছি, আগে হয়ত বা এমন ছিল না কিন্তু বর্তমান সভ্যতায় এখন অবশ্যই অপরাধ। যার যার নিজস্ব জাৎ তার তার, এক্ষেত্রে মা মেয়ে, কিংবা বাবা ছেলের মধ্যে কোন করম আপোস নেই। আমি সেইরকম অপরাধ তো করেইছি আবার অনদেরও অপরাধ করছি। কিন্তু আমার স্বিকার করতে এতটুকু দ্বিধা নেই কি। যে, আমি লোভ সংকরণ করতে পারিনি। একটা অতি সাধারণ মানুষের প্রেমের চিঠি কেমন হয়, ঠিক প্রেমের নয় মানে স্ত্রীকে লেখা চিঠি আর কি। লোকটি নিমগ্রেডে সরকারী চাকুরে কাজ করে বড় সাহেবের বাসার। সে তার স্ত্রীকে চিঠিটা লিখেছে লাইনটানা কাগজের পাতলা খাতায়। মনে হয় সে একটানা লিখতে সময় পায়নি। তাই এক কথা থেকে অন্য কথায় দিব্যি চলে গেছে, আর আশ্চর্য যে চিঠিটা একেবারে কথা বলার ভঙ্গীতে লেখা, যা আসাকে ভীষন রকম ধরে রেখেছিল। বলতে লম্বা এই যে এমন অপরাধ আমি সুযোগ পেলেই করি। এ ক্ষেত্রে আমি অবশ্য মোটেই চেষ্টা করিনি এটা আমার হাতের নাগালে এসে গিয়েছিল। বেচারা খতাটা কাপজস্ত্রি করার টেরিলে কি যেন কেন যে এনেছিল, আর পুরানো বিচিত্রা রোববারের সাথে রয়ে গিয়েছিল। পেপার নিয়ে রাখতে যেতে যেতে জানি না, আমি ব্লাউজ আনতে পাতা উল্টে দেখি, তারপর নিয়ে আসি ঘরে। পরে রেখেছিলাম ঠিকই কিন্তু হুবহু কপি করে নিয়ে। তবে ছোট বেলায় এরকমই একটা আশায় করেছিলাম। সেট ছিল আমাদের বাসার পিত্তনের নমে আসা চিঠি। আমি খুলে পড়ে নিয়ে আবার খামটা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ওটা তার স্ত্রীর লেখা চিঠি। তখন মাত ক্লাস সিক্সে পড়ি, চিঠিতে বোধ হয় তেমন কিছু ছিলোও না, কিংবা মনে নেই শুধু মনে আছে যে তাতে ছিলো ”কেন তুমি ঘন ঘন আসনা, এই কথাটা বোধহয় দুই তিন বার ছিল। আর আরও বেশি করে টাকা পাঠাবা নাহলে চলে না। এই লাইনটাও একাধিকবার ছিলো।”অত্যন্ত দরকারী চিঠি মনে করে আমি তখনি মুখবন্ধ করে নিজেই পিওনভাইটার হাতে দিয়েছিলাম। আর এবারের চিঠিটা আমি আপনাদের সবার হাতে তুলে দিছি। শুধু তার লেখা ভাষার বদলে আমি সাধারণ চলিত ভাষর করে নিয়েছি তারাবাণু গো, ওগো আমার তারাবানু সেতারা, আমার ভালবাসা নিও, সবকিছুইতো তোমাকে আগেই দিয়ে দিয়েছি আমার, আমার প্রান দিয়েছি আমার মন দিয়েছি। খালি একটা জিনিসই বেশী দিতে পারি নাই সেটা হচ্ছে অনেক টাকা পয়সা। আমার এই চিঠি পড়তে পড়তে আমার কথা, মনে করে তুমি বার বার আঁচল দিয়ে চোখ মুছো না। আল্লার রহমতে আমি এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। আমি এখন আগের চেয়ে আরো কিছু বেশি টাকা পাঠাতে পারব। তুমি শুনলে খুবই খুশি হবা যে আমি বড় সাহেবের ভাসায় কাজে লগেছি। এই বাসার কথা আমি আস্তে আস্তে অনেক কিছুই লিখব। কিন্তু তার আগে তোমার কথ শুনে নেই। আমার আকাশের তারা সেতারা গো, তুমি ভালো আছ তো ? কতদিন তোমার চাদমুখটা দেখি নাই বলতো। তুমি তো নিজেই তারা, তুমি চাঁদের খুব কাছে কাছে থাক। তাই তুমি আজ থেকে শুধু সিতারা না তোমার নতুন একটা নাম দিলাম চাঁদবাণু। তোমার মনে আছে ? সেদিন তোমার তারাবানু নামের বদলে আমি সিতারা রেখেছিলাম বলেছিলাম। সেতারা মানেও তারাই। তুমি খুশি হয়ে বলেছিলে, তাহলে আমার নাম আমারই থাকলো। আমি বলেছিলাম, হা গো হা, বলেই তোমার গালে চুমু দিয়েছিলাম। তুমি লাজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলে, বলেছিলে, দিনেদুপুরে কি যে কর! ছি: দরজা খোলা, কেউ দেখে ফেললে আমি আরেক গালে চমু দিয়েছিলাম, বলেছিলাম আমার ইচ্ছা আমি আমার সেতারাকে চুম খাব, তাতে কার কি, তুমি আমার বউ না? বউ হলেই কি? বলে তুমি ছুটে পলিয়েছিলে। আজকেও তোমাকে একটা নতুন নাম দিলাম, ইচ্ছা করছে। সেদিনের সতই আদর দেই। আমি কিন্তু দিলাম। তুমি মনে মনে নিয়ে নিও। লজ্জায় লাল হলেই তোমাকে বেশি সুন্দর দেখায়। এখন তোমাকে আমি আগের থকে অনেক বেশি টাকা পাঠাতে পারব। তোমার আর কোন কোন কষ্ট থাকবে না আর আমারও দুঃখ থকবে না। আগে বলেছি না যে আমি এখন বড় সাহেবের বাসায় কাজে লেগেছি। এই সাহেবের বাসা অন্যসর সাহেবদের বাসার মত না, এরা খুব ভালো আমার তিন বেলা খাওয়া দাওয়া ফ্রী আর খুব সুন্দর একটা রুম পেরেছি আবার সথে আমার জন বাথরুমও আছে। আমার খওয়ার জন আগে ছরশত টাকা মেসে লগতো তাও এখন আর লাগবে না আর আমার দেওয়া রেশন বিক্রি করলে তিনশটাকা পাব। বেতনের উপরে বলতে পার এখন থেকে আমার একহাজারের বেশি টাকা থাকবে। আচ্ছা একটা বুদ্ধি দিও তো, তুমি ভালো বুদ্ধিই দিবে আমার ধার না। এই বেশি টাকা টা কি আমি — তোমাকে পাঠাব? নাকি তোমার জন্য সখের জিনিস পত্র কাপড় চোপড় কিনব, নাকি ব্যঙ্কে রেখে জমাব কিছু কিছু। আমার তো শুধু তেল সাবানটুকু ছাড়া কোন হাত খরচই লাগে না। আমি বিড়ি (সগারেট খাই না বলে তুমি আমাকে বেশি বেশি ভালবাস তাও বুঝি। কতদিন তো বলেছ, তোমার নিজের কোন সাদ আল্লাদ নাই শুধু আমার জন্য এতো এতো খরচ কর। এতো স্নো অন, তেল অন, ফিতা ক্লিপ আন বডিস আন। এতো এনো না তো আমার লাজ্জা করে। এতে অনদের চোখ টাটায় । চোখ টাটানের কথাতেই মনে হলো, তোমাকে বেশি টাকা পাঠালে আবার অন্যদের হিংসা হবে না তো? আবার তোমার কাছ থেকে সবাই ধারও চবে, তোমার তখন খুবই জ¦লা হবে, তুমি তো আবার কেউ চাইলে ফিরাতে পাড়বে না। তোমার সেই সইয়ের বোন সে টাকা ধার নিয়েছিল সে কি শোধ দিয়েছে? না দিয়ে থাকলে আর জোর করো না। এখন আমাদের ৩৩ অভাব থকবে মার শরীর কেমন আছে, আমি থকলে আমার সে সেবাটুকু তুমি করতে তার একটু খানি মার জন্য করলেই মা খুশি। মাও তো তোমাকে মেয়ের মতই দেখে। তোমার মতন বউ পেলে কেই না খুশি হয়। তোমার শরীরটা কেমন আছে? তোমার জন আমার খুবই চিন্তা হয়। এখান কার বেগম সাহেবের কথা শুনবে? একেবারে অপ্সরীর মতো সুন্দরী, তাকে দিনে মাত্র চারবার আল্প একটু সময়ের জন্য দেখি। সকালে নাস্তার টেবিলে, দুপুরে খাওয়ার টেরিলে, বিকেলে চায়ের টেবিলে আর রাত্রে ডিনারের টেবিলে। যতবারই তিনি আসেন একটা মিষ্টি গন্ধ তখন বাতাসে ভাসে। আমার ইচ্ছা করে জোরে একটা নিঃশ^াসে টানি কিন্তু ভয়ে টানি না, তাছাড় ওটা তো করবে বেদবেরা একটা চেীদ্দ পনের বছরের ছোকরাও এই বাসায় কাজ করে, সে খুব বেয়াদব, সে সাহেব আর বেগম সাহেবের সামনে খুব ভালো মানুষ সেজে থাকে আর ওনাদের আড়ালে এটা সেটা বলে হাসে। ও ভাই দেখেছেন, বেগম সাহেবের বলে, হাত দুটো দেখেছেন, যেন একেবাড়ে লকলকে লাউরের ভগা। পায়ের পাতা কতো সুন্দর করে ফেলে দেখেছেন। হিল না পড়লে বোঝাই যায় না যে উনি হাটছেন বেগম সাহেব একেবারে যেন পরী। ওড়ে ওড়ে চলে খুব আমাদের সাহেবের ভাগ্য ভালো। আর বেগম সাহেবের কথা কেমন জানো যেন বাশীর সব গো কত সুন্দর করে কথা বলে যে কি বলব। ওনার বলা কোন কাজ আর তাই ভাড়ী লাগে না। আর ওই বহুতে ছোড়াটা কি করে জান? কাজ বুঝেও একই কথা বার বার বেগম সাহেবকে জিঙ্গাসা করে খালি কথা শোনার জন্য। কি সুদর যে দাতের পাঠি, একেবারে ঝকঝকে, বকের পালকের মত সাদা, সেই কানিবকটা কি এখনও আশি^না আমগাছটার মধ্যেই থাকে? ও যে একলা একলা কের থাকে বুঝি না, কুক, কানি বকটা আমার হয়ে তোমাকে পাহাড়া দেয়। উঠানের কামরাঙ্গা গাছটা কত বড় হয়েছে? মনে হয় এবছরে কামরাঙ্গা ধরবে। বেগম সাহেরর গারের রং একেবারে পাকা কমরাঙ্গার মতো, মনে হয় যেন কাঁচা হলুদ মাখনে যাকে সারাক্ষণ। তুমি যেমন করে রান্না কর এখানে তেমন রান্না চলে না। তোমার সে রান্না করতে কি কষ্টই হয়, পাতা সাতা দিয়ে যে চুলা জ¦ালান কত যে কঠিন আর অত মুটেও তো বৌধ হয় নাই, একটাই তো মাত গাই গরু আর বাছুর, কতটুকুই বা গোবর হবে। আর পাট কাটির সোলাই বা কত কাটবে। এখানে গাসের আগুন দেখলেই তোমার কথা মনে হয়, তোমার লাল চোখ দুটো আমার চোখে ভাসে। এখনও কি সরকার বাড়ির ধান সেদ্ধ কর আর সুকায়ে দেও? এত বড় মাটির পতিলগুলো কত কষ্ট করেই যে তুমি চুলার উপাড়ে নমাও আর উঠাও। ইচ্ছা হয় দৌড়ে যেয়ে নামায় দিয়ে আসি। তুমি আর অত খেটো না গো, এখন আর তো আমাদের অত আভাব না, তুমি ওই বাড়াবানার কাজটা আর নিও না। আমার মনে হয় দুয়িার সবচেয়ে কঠিন কাজ ওইটা। তুমি শরীটা কে খেটে খেটে মটি করে দিও না। আমার মনে হয় আমি এখম ঘন ঘন আসতে পারব। একবার বেগম সাহরের মন জয় করতে পারলেই হয়, তখন মাসে মাসে আসতে পারব। তখন তোমার হাতের কচু শাক রান্না খাব। কালো কচুর খুব ডাল পালা মেলেছে তাই না? লিশ মাছের মাথা কাঁটা দিয়ে তুমি যে কি মেলোয়েম করে রাধো, মুখ থেকে সরাতে পারি না, এখানে এসব নেই। শুধু ফ্রাই ট্রাইয়ের ব্যাপার মানে মাছ ভাজাই বেশি আর ভুনাটুনা হয় কিন্তু দেশর সত মাট মাট হয় না। ইচ্ছা আছে তোমার হাতের রান্না এনে একবার বেগম সাহেবকে খাওয়াবো কিন্তু কি বলে কেমন করে টেবিলে দেব তাই ভাবছি। থাক বাব, যদি মুখেও না দেয়। তাহলে আর অপমানের সীমা থাকবে না। তার চয়ে বরং তোমার হাতের পাকান পিঠা এনে দেব। শুনেছি বড় সাহেবরা খুব দাম দিয়ে দোকান থেকে পিঠাপুলি কিনে আনে। তোমার জন গুলিস্থান থেকে একজোড় সেন্ডেল কিনেছি। রংটা লাল আর খয়েরীর মিশান। দোকানদার বলে এটা মেরুন রং, কিন্তু মেরুন কি তা আমি জানি না। রোজ প্যাকেট থেকে সেন্ডেল জোড়া বের করি আর মুছি। বেগম সাহবের কত যে জুতা কে জানে। একেকদিন তিনি একেকটা পায়ে দেন। বেগম সাহেব বাইরে চাকরি করতে যান। তিনি সব সময়ই হেসে থাকেন কিন্তু তখন আরও সুন্দর সাজেন। বেগম সাহেকে বলে, তোমাকেও আমি ঢাকায় নিয়ে আসব, একটা বাসা ভাড়া করব। নাকি এই মটাতেই থাকতে দিবে, দেখি কয় মাস যাক আগে। তুমি এখনি কাউকে কিছু বলো না এ ব্যাপরে। নতুন করে আর কয়েল পড়ো না, এবার আমরা রাচ্চা নেব। তুমি কি চাও ছেলে না মেয়ে ? ুএক অমনি লজ্জা পেয়ে গেলে? ঢাকায় আসলে তোমাকে একটা সিনেমা দেখাব দেখো এখানে কেমন মেলামেশা লাজ লজ্জা বলতে কিছুই নাই। ওরা মানুষের সামনেই লজ্জা করে না আর তুমি তোমার স্বামীর সামনে লজ্জা করবা? মুখটা একটু তোল গো দেখি, আমি নাই বলে একটু স্নোও লাগাও নাই, আর কাজলও দেও নাই? মাথাও রুক্ষন করে রেখেছ? কি কি যেন খোপার নাম, অউলা খোপা, চাউলা খোপা, বিছা খোপা, চুড়া খোপা, পাটি খোপা, কোন টাই কর নাই? আচ্ছা থাক, আমি আসলেই কোর। গাইটা কি ভরন হয়েছে? নাহলে ওকে কাউকে দিয়ে সরকার বাড়ীর সাঁড়ের কছে পাঠিও। সুরগীর ডিম মাঝে মধ্যে দুই একটা করে খেও, এখন আর অত অভাব নাই আমাদের বুঝেছ? (চিঠিটায় হয়ত আরও লিখবে সে, কিন্তু আমি এটুকুই পরেছি)
Read Also :-
Labels :
#একটা চিঠি ,
Getting Info...