শীতের কুয়াশা

শীতের কুয়াশা

 শীতের কুয়াশা 




অনামিকা হক লিলি।

গ্রামে ফিরে এসে ছোট্ট এ কটা চায়ের দোকান দিয়েছে ঢোকার মনু।ওকে কেউ এখন শুধু মনু বা মনু মিয়া বলে চেনে না। তাঁর নামের আগে জোকারটা এমন ভাবে লেগে আছে।চায়ের দোকান বললে বেশ বড়ো কিছু মনে হয়।ফলে দোকান না জু পড়ি বলাই ঠিক?তা শুধু কেরোসিনের তুলো আরস্যার চার টি কাঁপি শুরু ছিল।কিন্তু গ্রামের ছেলেরাই ভালবেসে তাঁর দোকানটা চালু করে দিল।ওরা এরপর বাঁশ যার থেকে চেয়েচিন্তে দিব্যি বসার ব্যবস্থা করে নিল।সাদা তুলে দুধের করায় চায়ের কেতলি কিনে নিল।সাথে পান সিগারেট রাখারও বুদ্ধি দিল আরও টুকটাক।বেশ জলে দোকানটা।তাই ফুড ফর মাসের জন্য ছোট এ কটাপিচ্চি দৌড়ঝাঁপ করে। দোকানথেকে দেখতে পাওয়া দূরত্বের মধ্যে গ্রামের নতুন কলেজ।বেশ লাগে মনুর।গ্রামটা আস্তে আস্তে আধুনিক হয়ে উঠেছে।মেয়েরাও ছেলেদের সাথে পড়ছে।মাঝে মাঝে এর সাথে চা খেতেও আসে।করা শুধু হাসি ঠাট্টা করছে।কারা প্রেম প্রেম খেলছে সব বুঝতে পারে মনু।জীবনের এই চলমানতা এই সাফল্য এই আনন্দ উজ্জ্বলতা টুকুও খুব ভাল লাগে।ওঁদের চায়ের কাপে একটু বেশি চিনি দেয়।ঘন দুধের সর দেয়।থাকলে মনও এ কাপ চায়ের বদলে এক কাপ দুধ খেতে বলে।ওরা হাসে বলে।আরে তুমি দোকানদার না বাড়ির গার্ডিয়ান।আসলেই অন্যরকম।কিন্তু বলে না এমনি আপনাদের হাসানোর জন্য বললাম।সারা জীবন জোকারই করেছি তো।না না কষ্ট তো দেখতে চায়।সে সময়ে নানা কথা শুনতে চায়।মুনু বলে না ভাই কোনও কসরতই আর দেখাতে পারব না।যা শেষ হয়েগেছে তা একেবারেই গেছে।ওকে আর স্মরণে রাখতে চাই না।স্মরণে এনে কষ্ট পেতে চাই না।বরং আপনারা গল্পে করেন আমি শুনি।কিন্তু তুমি কী করে জোগাড় হলে সেটা অনন্ত বলো।সে তো সার পাঁচ মিনিটের ব্যাপার।হঠাৎ করে ইসা করলাম ব্যাস পিছু পিছু চলে গেলাম।সেবার ওই যেবা অনেক অভাব পড়েছিল দেশের গ্রামে তো ঘরে ঘরে হাভাত অবস্থা। সে বছরই শীতের মৌসুমে।স্কুলের মাঠে এক সার্কাসেরতাতাঁবু পড়ল।মানুষের পেটে ভাত নেই। কিন্তু সার্কাসের তাঁবুতে সে কীভিড়। তাই পাটের পিল থেকে এক আঁটি পাট নিয়ে।সালের ঢোল থেকে এক কাঠা চাল নিয়ে।কিংবা হাঁস মুরগি টা বেঁচেও তাঁবু ভরিয়ে তুলেছিল।বলছিল জীবনে এমন সুযোগ একবারই আসে।গ্রামে সার্কাস পার্টি স্বাদ দিন মাত্র থাকবে।এমন সুন্দর আর নামকরা পার্টি এসেছে।যাঁরা কমলা সার্কাস দেখেছে।বলে নাকি ওরকমই প্রায়।এটা মেয়ে আছে নাম নাকি রমলা রেখেছে।আর তাই সার্কাস পার্টির নাম রমলা সার্কাস।আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি।স্যুপ করে লুকিয়ে বাজার থেকে কুড়িয়ে পোড়া বিড়ি খায়।সালের কলের দোকানে সালমা পার কাজ করি। আর মুঠো মুঠো চাল চাবি দিয়েই নিজের খিদা মেটাই আর পাওনাটা নিয়ে যায় মার জন্য। সেদিন মালিকের চাল চুরি করে সার্কাস দেখার টিকেট কিনলাম।কী বলব? বিস্মিত মগধ।তাজ্জব কিংবা একেবারে পাগল হয়ে গেলাম।আহা সে কী যে ভাললাগা।আবার কি করে যাওয়া যায় ভাবছি।মার কাছে ডিম বিক্রির পয়সা কোথায় জমানো থাকে জানি।চুপ করে নিবো নাকি লুকিয়ে সবাই সবার ভাবছি।সারাদিন সুযোগ খোঁজার জন্য বাড়িতেই ঘুরে ফিরে করছি মার সন্দেহ হলজিজ্ঞাসা করল কী রে মনে?কিছু বলবি।আমি একে বারে নাটকীয় ভাবে মায়ের পা চেপে ধরলাম।আজই করলাম।মা তো হত ভূম।আবদার না রেখে তারপথথাকল না।.শুনলাম গিয়ে এ দিনই শেষ সু,রমলা ছোট্ট এই কটা বালিকা।নাকি বড়ো মেয়ে?জানি না। কিন্তু যখনই দড়ির উপর দিয়ে ছাতা হাতে যায় তালিতে তালিতে চার ও দিক ভোরেযায়।যখন চাকার সাইকেলে উঠে তখনো তেমনি আর খুব উঁচু দোলনা থেকে অন্য দোলনায় দড়ি ঝুলে গেলে তো কথাই নাই।মনে হচ্ছিল তালি দিতে দিতে হাতের তালু ফেটে বুঝিয়ে রক্ত বের করে ফেলব।তাও তালি থামব না।রমলা যেমন সুন্দর নাম তেমনই সুন্দর দেখতে।ফর্সা টানা টানা চোখ আর গোলাপি লাল নীল কেক সময়কে রকম ফ্রকে কী সুন্দর যে দেখাচ্ছিল।কখনও মনে হচ্ছিল আমাদের উত্থানের ধারের স্থল পথের মতো।কখনও মনে হচ্ছিল গোলাপ ফুল।সুনীল আকাশে যেন সাদা বক পাখি।আমি এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে পরদিন দলের পিছে পিছেযাচ্ছি তো যাচ্ছি।ওরা খোলা।গাড়িতে আর পায়ে হেঁটে লম্বা লাইন করে গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছিল।সব পিছনে যাচ্ছিল বানরেরখাসা।বাঘের খানা আর সিংহের খাঁচা।আমি বারবাররমনাকে দেখার জন্যও কি ঝুঁকি দিচ্ছিলাম।কিন্তুঅনেক গুলা একই বয়সেরএকই।পোশাক পরা মেয়ে একসাথে গরুর গাড়িতে ঠাসাঠাসি বসা।ওর ভিতর থেকে রমলাকে সিনে একপলক দেখার কোনও উপায় ছিল না।বরং বানরগুলোর বংশী কাটা দেখে লজ্জা পাচ্ছিলাম।মনে হচ্ছিল বুঝি আমার জন্য এ রকম করছে ওরা।তাই মাঝে একবার দোর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ওদেরবহরের মাঝামাঝি এলাম। যেখানে চোঙ্গা ফুঁকেফুঁকে ওঁদের আগামী সু করে কোথায় হবে সে কথা বলছে।টেনে টেনে সুরে সুরে যেমন বলছিল আমিও সেই লোকটা থামার ফাঁকে ফাঁকে ঠিক তেমন করেই বলেছিলাম।ওদের নজরে পড়ে গেলাম।আমাকে তুলে নিল আর ঐ ভাবে জুড়ে জুড়ে বলতে বলল।আমি আমার সবটুকু শক্তি দিয়ে মমতা দিয়ে গলার সুর এর উঠানামা দিয়ে নিজেই মোহিত হয়ে বলতে থাকলাম।সার্কাস সার্কাস রমনা, সার্কাস।তো অনেক কথা।তো রমোলা নামটা বলার সময় অজান্তেই আমার এক ধরনের ভালো লাগা যেন কাজ করছিল।আমি সবাইকে বিমুগ্ধ করেছিলাম।এ দিন তাই প্রচারকের ভূমিকায় আমার জায়গা হয়ে গেল।আর প্রচারকের পোশাক বেশ রঙিন।প্রায় জোকার এর মতোই।আমি বাড়ির কথা ভুলে গেলাম।মার কথাও ভুলে থাকলাম।আশ্চর্য এই সম্মোহনী শক্তি ছিল এই সার্কাস পার্টিতে।রোসার কাজ শুরুর আগ পর্যন্ত সারাটা দিনই প্রায় চুঙ্গা মুখে আমি সার্কাসের গুণকীর্তন করতাম কখনও রিকশা কখনও টমটমে করে।আর সন্ধ্যা হলে সময় গুনতাম কখন সার্কাস শুরু হবে।রোজ বিনা পয়সায় রমোলার সু দেখতে পাওয়ার এমন সুযোগ কে আমার ভাগ্য বলেই মনে হত।হঠাৎ একদিন জো কার্টার সে দিন গায়ে ভীষণ জোর।মাথা তুলে উঠতে পারছে না তো সুকরবে কি?ম্যানেজার তাঁকে ভীষণ রকম শ্বাস আসছে।এই একদিনের জন্য তোর মাসের বেতন কাটব।জোকার তাঁর ছেলে মেয়ে বউ আর বুড়ো মায়ের কথা ভেবে তাদের সামনের মাস জুড়ে।ও।উঠে যাবে চিন্তা করে টলতে টলতে মঞ্চে পরে গেল এক ধারে।সে পরা যে।এপড়া না একেবারে অজ্ঞান হয়ে পড়া।দর্শকরা তাদের হাসি সাথে দ্বিগুণ হাসি যোগ করল।সার্কাসের একজনঠান্ডা মতন লোক এসে তাকে ধরেহিড় হিড় করে মঞ্চে থেকে টেনে নিয়ে গেল।লোক আরও জোরে হাসললাথি খেয়েও জোকার নিশা পরে আছে আর ঐ চিৎপাত পড়ে থাকবে জোর করে টেনে নিয়ে যাওয়া দেখে ভাবল এতো বুঝি সার্কাসের এক নতুন আর্ট।আমি দর্শকের জায়গা ছেড়ে ছুটে গেলাম ভিতরে।সে এই অমানবিক দৃশ্য।ওকে জ্ঞান ফেরানোর জন্য চাবুক মারা হচ্ছে।বকাঝকা হচ্ছে কেউ এতটুকুও পানি ছিটাতে না বাতাস করছে না বা ডাক্তারও ডাকছে না।আমি পানির ছিটা লাম একটু পরে জ্ঞান ফিরে এল। কিন্তু ভীষণ একজন জোকার এর জন্য তো আর সুবন্ধ করা যায় না।তার উপর এত এত দর্শক।একটু বুঝতে পারলেই হল চোখ মারা শুরু হয়ে যাবে।আমি সেদিন মঞ্চে গিয়ে উদ্ধার করলাম ম্যানাজারের আর তাদের সুকে।কে দেখতে সব খেলায় প্রায় শিখে ফেলেছিলাম। তাই জোকারের পোশাকে দর্শক তেমন বসে উঠতে পারেননি। আমি নতুন কেউ।বরং আনাড়িপনায় আরও বেশি হেসেছিল দর্শক।আমি জোকার হয়ে গেলাম। দুই দিন পরেও আসল জোকারের জোর কমলো না।আমি ওঁর কাছে গেলে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে ছিল সে কিন্তু একটু পরেই দেখলাম এক ধরনের ভয় ওর চোখে মুখে।ওর এই খেলা দেখানো চাকরিটা চলে গেলে বাড়িতে পরিবার না খেয়ে থাকবে।আমি অবাক হয়ে দেখলাম ওর জন্য কোনও চিকিৎসার ব্যবস্থাটা করা হয়নি। এই অন্ধকারে বিছানার সাথে এমনিতেই লাগা একেবারে।আশ্চর্য হয়ে দেখলাম রমোলা এঁদের মধ্যে একটু অন্যরকম।ওর হাতেও তেমন পয়সা নেই। তবু দুইএ কটা ট্যাবলেট কিনে এনে দিত।হাতে তখন ওই জোকার এর সাথে ঘুমাতাম।মাথায় জলপট্টি দিতাম বাতাস করতাম।একদিন ওই বিছানাতেই চিরদিনের জন্য টান টান হয়ে শুয়ে গেল সে।কেউ চোখের পানি ফেলো না।কেউই চোখের পানি ফেলল না।সার্কাসে কোনও ক্ষতি হল না।নতুনগ্রামে নতুন যুগআর এই আমি পার্মানেন্ট হয়ে গেলাম।মাস শেষে রমোলা তাঁর টাকার কিছু টাকা ঐ জোকারের বাড়ি পাঠানোর জন্য আমাকে পাঠাল।আমি রমোলার এই বদানো তা দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম।নিজের কিছু টাকা মিলিয়ে দিতে গিয়েসে বাড়ির যে অবস্থা দেখলাম তাতে আমার মুখ দিয়ে কিছুতে বের হল না। যে বলি তোমাদের রোজগারের সেইলোকটা আর নাই।কোনওদিনও ফিরে আসবে না।আর ওখানে গিয়েই আমারও সম্বিত ফিরে এল।আমার বাড়ি আমার মা ওদের সাথে মিলে মিশে বারবার আমাকে বিষণ্ণ করে তুলল।মুখে ফিরে এলাম।সুযোগ মতো রমলাকে সব বললাম।দেখলাম রমোলার চোখে পানি।একই গ্রামেই রমলাবাড়ি।একইদিনে একসাথে ওরা সার্কাস এসেছিল।রমলা ভালবাসত জোকার আক্কাসকে।আর ক্লাস ও।অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন হলে ওদের হয়ত বিয়ে হতো।ওরাও সংসার করত।দরদর করে নানা চোখের পানি দুই হাত দিয়ে মুছে শেষ করতে না পেরে আঁচল তুলে নিল।আর জিজ্ঞাসা করল আমাকে।এই আমাকে তুমি কেন সার্কাসে এসেছো?আয় রোজগারের কোনো পথ আর ছিল না।আক্কাস আর আমার স্বপ্ন কী ভাবে?পরে সাইহয়ে গেল। দেখলেন না।তুমি তো এখনও অনেক কাঁচা বয়সের।এই ভাবে লোক হাসিয়ে নিজেকে হাস্যকর করছ কেন?জোকারের বিছানায় চিরতরে ওইভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য।আর অন্তরের কথা আমার অন্তরে রয়ে গেল।বলা হল না শুধু তোমাকে একবার দেখব বলেই প্রথম রওনা হয়েছিলাম বহরের পিছু পিছু।বলা হল না,অকুঋ তভালোবাসার কথা।কিন্তুরমোলার ওই কথাগুলো মনের ভিতর তোলপাড় করছিল সেদিন।আর তার পরেও।তবু আরও কিছুদিন হয়ে গেল আমি সার্কাসে।যতদিন না আক্কাসের পরিবারের এ কটাসুরাহা হল।আস্তে আস্তে জেনেছিল ওরা।মেনে নিয়েছিল বাস্তবটাকে।রমলা ম্যানেজারের কাছ থেকে আদায় করে দিয়েছিল এককালীন কিছু টাকা। অন্যের জোর করে জবরদস্তিকরে।রমনা তাঁদের দলের একজন নায়িকা বলেই এতটুকু মেনেছিল ম্যানাজার।হঠাৎ একদিন মাঝরাতে ঝমঝম বৃষ্টির মধ্য সবার অলক্ষ্য ধরেছিলাম নিজ গ্রামের পথ।বেদনাহত দুইটি মুখ বিদ্যুৎ চমকের সাথে সাথেআমার ভিতরের চমকাচ্ছিল তার চেয়ে বেশি।যদি না দেখা মার মুখটা আর না জানি কেমন দেখব কী দেখব।আর পিছনে ফেলে যাচ্ছিরমলার মুখ। রমলা বলেছে, চলে যাও এখনো সময় আছে চলে যাও।তোমারবাড়ির সন্ধান আমি কাউকে দেব না।আর তোমার মতো জোকার হঠাৎ চলে গেলে এদের সুবন্ধ থাকবে না।আক্কাসের জায়গায় যেমন তুমি উঠে ছিলে তোমার জায়গা তেমনই কেউ না কেউ জুটে যাবে।তোমার খোঁজ নেবার দরকার ও তাঁদের থাকবে না।তবে তোমার ঠিকানা তুমি আবার বদলে ফেলো না কিন্তু।এখানে আমার দাম ফুরালেই আমি ঐ ঠিকানায় যাবো যে।চায়ের দোকান দিয়ে পথের মাঝে সেতু হয়ে বসে আছে।বাড়িতে মায়ের ছানি পরা চোখে দিকে আমারও বুঝি চোখে ছানি পড়বে রমলার পথ চেয়ে .রমলা কি সত্যিই একদিন আসবে।কি কথার কথা বলছিলে বলতে হয় বলে।তাকিয়ে থাকে দূরে বহু দূরে নিঝুমযেন দুপুরে।জাম জাম বৃষ্টিতে কিংবা শীতের কুয়াশা গায়ে মেখে একদিন রমোলা এসে বলল।মনু এইতো আমি এসেছি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না।
Read Also :-
Labels : #Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#পুলিশ গল্প ,#শীতের কুয়াশা ,
Getting Info...

Post a Comment