সাধারণ মেয়ে

অনামিকা হক লিলি
সোমার অতি সাধারণ মানে একেবারে মধ্যবিত্ত। ঘরের আট পুরো একজন।দশ জনের মধ্যে মিশে থাকলে কেউ আঙুল তুলে বলবে না।মেয়েটি তো বেশ,তবে একা৷একা কেউ কখনও তাঁকে নিরক্ষণ করলে তার আলাদা এ কটা ব্যক্তিত্ব চোখে পড়ে। বলায় একটু স্থির, বলায় চপলতা কম দৃষ্টি গভীর।তবু সোমা সাধারণ,অন্য আর দশ জন যেমন তেমন।উপজেলা শহর থেকে এসএসসি পাস করলো সোমা।মোটামুটি ভালই করল,আর সবার মতোই ক্লাস এইট নাইনে থাকতে বরই গাছে ঝাকি পড়তে থাকল।সোমা স্থির সুরে বলল।বাবা আর একটু অপেক্ষা করো।কিন্তু এসএসসি পর তার চেয়েও কঠিন করে বাবাকে বলতে হয়েছিলকিন্তু। তাতেও বাবার মনসাঁই দিচ্ছিল না।আর মার তো মোটেই না।অবশেষে অনুনয় বিনয় করে। তবে সোমা ভর্তি হতে পেরেছিল কলেজে।বিয়ে না করে কলেজে ভর্তি হওয়ায় মায়ের সাথে অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা মন কখন হলেও সমা গায়ে মাখেননি।বরং খুব অল্পদিনের মধ্যেই সোমা সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল।পড়াশোনা আর তার অন্যান্য ব্যক্তিত্বের কারণে।সেলেরা যারা বড় তারা স্নেহ করত,যারা ক্লাস মেন্ট তারা সমীহ করত,আর যারা ছোট তারা শ্রদ্ধা।সোমা নিজেরই অর্জিত পাওয়া ছিল এসব।হয়তো বা এ কারণে সোমা আস্তে আস্তে একটু একটু করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।এমন বড় কোনও চাওয়া নয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত ঘরে পাঁচ।ভাই বোনের মধ্যে এভাবে ভাবা মানেই মা বাবার দুশ্চিন্তা বাড়ান ঘুম নষ্ট করা।তবু সোমা তাই করল।শহুরে বাতাসে নয় সমান নিজের মধ্যেই কেনযেন মনে হতে লাগল,সে নতুন কিছু করবে,অন্য অনেকের চেয়ে নতুন কিছু। কিন্তু কী?তাই এ রকম যখন ভাবছিল তখনই যেন এ কটা পথও পেয়ে গেল সে।একেবারে হঠাৎ করেই চোখে পড়লো খবরের কাগজ।বাসায় কোনও খবরের কাগজ রাখার প্রশ্নই ওঠে না।বাবাঅফিস বা বাজারে পরে আসে।আর বাসায়এ কটা একব্যান্ডে রেডিও আছে যাতে শুধু ঢাকা শোনা যায়।বাবা আর ভাইয়েরাও টাতে খবর শুনে।খেলা শুনে গান শুনে।খবরের কাগজটা পেয়েছিল সে কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব এর রুম।কলেজে মেয়েদের জন্য একটা কমন রুমের ব্যবস্থা করা যায় কি না। এ নিয়ে মেয়েদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছিলো সোমা।নতুন কলেজ,কোনও রকমে ক্লাস চালু হয়েছে মাত্র।তবে ছেলেরা এর মধ্যে এ কটা অর্ধসমাপ্ত ঘর কেকমনরুম করে নিয়েছে।ক্যারাম,বাঘা ডুলি,সোলসে এখন টেবিল টেনিসের টেবিলের অপেক্ষায় রয়েছে।সোমা মেয়েদের জন্য এ রকমই বলতে গিয়েছিল।প্রিন্সিপাল ব্যস্ত থাকায় ওঁকে দাঁড়াতে হয়েছিল কিছুক্ষণ।আর সেই অবসরে সে খবরের কাগজের পাতা ওলটাচ্ছিল।আর হঠাৎ করে চোখে পড়ল,বারবার করে পড়লো সোমা।প্রিন্সিপাল যখন বলল,বলো এবার কী বলবে?তখনও কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে সোমা।আসলে সোমা তখন আর সোমার ভিতরে ছিল না।অনেক অনেক দূরের অনেক কিছু ভাবছিল সে। সোমা বস্তির ফিরে বলল।স্যার আমি অনেক অনেক কিছু বলতে চাই।এসেছিলাম শুধু মেয়েদের জন্য এ কটাকমন রুম চেয়ে নিতে। এখন সেটা তো বটেই। তা ছাড়াও পুরনো অধিকারে ন্যায্য পাওয়ায় আমরা মেয়েরা অনেক কিছু পেতে চাই।প্রিন্সিপাল অবাক বিস্ময়ে সোমার দিকে তাকাল।সোমা পড়াশোনায় ভালো বলে সবাই ভালবাসে।ওঁর অন্যান্য অনেক গুণ আছে।কিন্তু আজকের এই সোমা কোন সময়।সে কোন অধিকারের কথা বলছে?এ সব সে পেল কোথায়?সে বলল, আসলে বলো তো কী বলতে চাও তুমি।সোমাও যেন স্যরের চোখে একটু প্রশ্রয় পেল।তাই অকপট হতে সাহস পেল।বলল, আমার জীবনটাকে অন্য রকম করে ভাবতে ভাল লাগে।এই বৃহত্তর সমাজের অধিকাংশ মেয়ের যে পরিচয় বা অবস্থান সেটার বাইরে আরও কিছু।প্রিন্সিপাল বিস্মিত হয়ে বলে।কি রকম?তুমি কীসের কথা বলছ?আমি নারীমুক্তির কথা বলতে চাচ্ছি স্যার।বলতে চাচ্ছি নারী স্বাধীনতার কথা।বলতে চাচ্ছি, এই সমাজের জন্মলগ্নে যে নারীর অবস্থান চিহ্নিত হয়ে যায়। কোন পরিবারের কন্যা,যায়া বা জননী রূপে,সেই শিশুকাল থেকেই আমরা ভাবি, আমরা কারও না কারও গলগ্রহ।আমাদের চারপাশে শুধু সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজাল।আমি এসবকে কাটিয়ে উঠতে চাই।কিন্তু কী ভাবে তা সম্ভব হবে বুঝতে পারছি না।আপনি পারেন আমাকে পথ দেখাতে।বাবা তো আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে।মা তো সারাক্ষণই আমার উপর রুষ্ট কিন্তু আমি।তুমি তোমার বাবাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।আমি তাঁকে বলব,যাতে তিনি তোমার পড়ায় ব্যাঘাত না করেন,এই তো,আর তোমাদের জন্য কমন রুম অবশ্যই দিব।ওই নতুন বিল্ডিংটার কাজ শেষ হয়ে গেলে মেয়েদের কমন রুম হবে।সোমা ফিরে এলো,স্যারের কাছে এতগুলো কথা বলতে পেরে তাঁর খুব ভাল লাগছে।মনে হচ্ছে, সামনেই তাঁর যেন প্রত্যাশার ডালি সাজান।হাতে করে সে প্রিন্সিপালের ঘর থেকে খবরের কাগজটা চেয়ে এনেছে।বাবাকে তাঁর মনের ইচ্ছের কথা বললে খুব কি চমকে উঠবে।মা কি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবেন।পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন তাঁরাই বা কী বলবে?যে যা বলে বলুক?সোমা স্থির সিদ্ধান্তে অ ক্রমশ মনে মনে আসতে থাকে।আর তাই এ দিন সাহস করে বাবাকে এটা পেয়ে বলে।আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের তাই না বাবা,বাবা বলে,কেন কি হয়েছে?মধ্যবিত্ত তো বটেই।উচ্চবিত্ত হতে পারলাম কই?সোমা না বাবা কোন আফসোস করে বলছি না।বলছি, নিম্নবিত্ত হলে,আমরা ছেলেমেয়েরা এ বয়সে সবাই সংসারের কাজেআসতাম। কিন্তু মধ্যবিত্ত বলেই,আমরা সবাই পড়েছি। আর একমাত্র তুমি উপার্জনে হাত হয়ে উপার্জন করে যাচ্ছ।বাবা তুই এত সব ভাবলে কী করে?আর ভাবছিস ই বা কেন?সোমা ভাবতে নয়,বুঝতে পারছি বাবা,ক্রমশই বুঝতে পারছি বাবা,ক্রমশ বুঝতে পারছি মধ্যবিত্ত কত দায়?আমাদের মান সম্মান বজায় রাখতে হয়।পরিষ্কার পরিছন্ন থাকতে হয়,করতে হয় নানা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা,যার জন্য প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও।আমাদের রুসির প্রশ্ন টনটনে।আমাদের সংস্কৃতির প্রতি অনুমান,আমরা পিতা নামক একজনের ঘাড়ের উপরে বসে সত্য ও সুন্দরের স্বপ্ন দেখি।আমরা রবীন্দ্রনাথের গান গাই,নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করি,জীবনানন্দের রূপসী বাংলায় রূপ দেখি।বাবা,তোর আজ কি হয়েছে বলতো?এত সব এভাবে ভাবছিস বলছিস,এসব সবই সত্য কিন্তু এসব ভেবে কী লাভ বল।এজন্য বলছি বাবা,যেইখুব সামান্যই আমাদের মান সম্মানের হানি হয়।আমরা বেকার থাকি তবু নতুন কিছুতে যেতে ভয় পায়।শঙ্কিত হই অপবাদের ভয়ে,আর এই কারণেই ক্রমশই আমরা অবক্ষয়ের মধ্যে নেমে যাচ্ছিবাবা, সবই তো বুঝলাম,কিন্তু এ তো সব বলছিস কেন?কী ভেবে বাবা আমি এ কটা চাকরির দরখাস্ত করতে চাই,চাকরির দরখাস্ত।এ ক্ষেত্রে মেয়েরা প্রথম যাবে।বাবা।এর আগে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্যও এ পথ খোলা ছিল না।আমাদের মধ্যবিত্তের জন্য চাকরির এই ক্ষেত্রটি আমার জন্য মনে হয় খুবই উপযুক্ত। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না বাবা।দেখি যদি এতটুকু কাজও হয় আমাকে দিয়ে।সমাজের জন্য, সংসারের জন্য বাবা অসহিষ্ণু হয়ে বললেন,ভণিতা করিস না তো?খুলে বল কী বলতে চাইছিস।বাবা আমি দরখাস্ত করব,মহিলা পুলিশ নেবে বলে কাগজে দেখেছি।আর ছোট্ট জীবনে সামান্য চাওয়ায় একজন পুলিশ হতে পারলে যথেষ্ট বড় পাওয়া হবে বাবা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবার শক্তি বা সামর্থ আমাদের নেই।হাতে নিতে হবে৷ আগে বা পরে খুন্তি আর।কড়াই।আমি না হয় বাবা এ কটালাঠি হাতে নিলাম।একটা অস্ত্র।যা দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটু হলেও দাঁড়াতে পারি।অতি সাধারণ সোমা পুলিশ হল মহিলা পুলিশ।
Read Also :-
Labels :
#Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#সাধারণ মেয়ে ,
Getting Info...