অচিন মন

অচিন মন

অচিন মন

প্রফেসর অনামিকা হক লিলি (অধ্যক্ষ, সরকারী বিজ্ঞান কলেজ)

ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি কিন্তু তিন দিন হয় এমন বৃষ্টি হচ্ছে যেন আষাঢ়ের ঘনঘটা, মৌ মৌ বাতাস, বিদ্যুতের চমক, মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির ঝাপটায় গাছের ডালের পাঁতার দাপাদাপি বেশ লাগছে। অফিসে তিন তলায় একেবারে কোনায় ছোট হলেও নিজের জন্য ঘর পেয়েছ। সে ঘরে আজ সে নয়টার মধ্যেই এসে পড়েছে। বৃষ্টির কারণেই হয়ত রাস্তা ফাঁকা । মোটরসাইকেল চালিয়ে আসে বলে অন্যকারও ধার ধারতে হয় না। ড্রাইভারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসের জন্য লাইন দিতে হয় না। নিজের কাছেই যদিও একটু অস্বস্থি থেকে যায় যে সে মোটর সাইকেলে আসে । সব বয়সের সব পদমর্যাদার জন্য মনে হয় বাহনের হেরফের থাকে, তাই কেউ কেউ একটু কেমন কেমন তাকায় সেটা বুঝি তবুও এই বাহনটাই আমার জন্য সাশ্রয়ী ও সময়কয় নেয় বলে মনে হয়। প্রকৃতিকে অত খেয়াল করে মন দিয়ে দেখেছে বলে মনে হয় না। যদিও অন্যসবাই বলেছে সাহিত্যে লেখা পড়া করলে নাকি আপনা থেকেই প্রকৃতি প্রেমিক হয়ে উঠে। কিন্তু যার মধ্যে ওইসব ভাবাবেগ মোটেই নেই, বাধ্য হয়ে ইংরেজি কিংবা বাংলা, হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, পালি, পড়েছে, তারা চাবাই কি সে রকম হয়ে যায়, নাকি যেতে পারে কখনই তা হতে পারে না বলেই তার বিশ্বাস। তাছাড়া সে তো তার নিজেকে দিয়েই বুঝতে পারছে। নিজেকে নিজে বিচার করলে বলতে হয় মা বাবার কথার অবাধ্য হওয়া এক একগুঁয়ে ছেলে। কি যেন কেন কিছুই ভালো লাগতো না তার। কোন কিছুতেই সন্তুষ্টি ছিল না। মা বাবা যা বলতেন বুঝতেন সবকিছুতেই খিচনিচ করাই ছিল কাজ। আর সে কারণেই কিনা বিধি বাহাই রইল, অনুকূলে বাতাস মোটে বইল না, ভাগ্য ফেভার করল না কোনদিক থেকেই। না হলো প্রাণের বন্ধু, না সহযোগী। অথচ সবই সে পেতে পারত অনায়াসে। ভালো বন্ধু হলো না নিজের ব্যবহারের কারণে। বন্ধু হয় একে অন্যের সমব্যাথী, যে নিজেকে ঠিকমতো প্রকাশ করতেই পারে না, সে অন্যের সহানুভুতি কি করে আশা করবে। আশা করেনি বা পায়নি কারণ সে পেতে চায়নি। আর তারই ফলভোগ এ পর্যন্ত। নিজের হাত নিজে কামড়ান ছাড়া উপায় নেই যখন, বোধদয় হলো। তখন কি আর মুখরে দেবার উপায় থাকে। বরং উল্টোটি হয়ে গেল। একটি মেয়ে পরিচিত হয়ে পড়ল কিংবা আমি তার পরিচিত হয়ে উঠলাম। কলেজের শেষ বর্ষ থেকেই কি যেন কেন এই উড়ু উড়ু মনটা আড়ে আড়ে মেয়েদের দিকে তাকাতে শুরু করলো। ভাবনা চিন্তা তেমন না করেই প্রেম হয়ে গেল। ভাবাই যায় বি.এ পাশ করার আগেই কাউকে প্রেমের কথায় বিয়ে করে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া । বড় লোকের মেয়ে প্রেম প্রেম খেলা খেলছিল বোধহয়। প্রস্তাবে চমকে তাকিয়েছিল, খিলখিল করে হেসে গায়ে গড়িয়ে পরে চুলে ঝাকুনি দিয়ে বলে উঠেছিল কি বলছ তুমি মনসুর ? বুঝে বলছনাকি না বুঝে ? সজ্ঞানে নাকি অজ্ঞানে ? বিয়ে ? এই বয়সে ? আমাদের ? বলেছিলাম বিয়ে করবে না তবে প্রেম করেছ কেন ? তুমি বড় লোকের মেয়ে হতে পার, কিন্তু ইচ্ছে মত খেয়ালীপানা করবে সে আমি সহ্য করব না। আমি তোমাকে চাই, তোমাকে না পেলে আমি আত্মহত্যা করব, বিষ খেয়ে মরব, মাদকাসক্ত হবো, আমি মজনু হয়ে যাব, আমি দেবদাস হয়ে যাব, আর তুমি এটা জেনে রাখ যে আমি এসব কথা একটাও বানিয়ে বলছি না, মিথ্যা ভয় দেখানোর জন্য বলছি না, আমি সত্যিই মরব আর আমার লাশ তোমাকেই দাফন করতে হবে। পাগলের মতো আরও অনেক প্রলাপ বকেছিলাম, আমি তোমার মান সম্মানধুলায় লুটিয়ে দেব, আমি ক্যাম্পাসে স্ক্যান্ডাল রটাবো, পোষ্টারে ছেয়ে ফেলব শহর। সিনেমার নায়কের সভা ডায়লগ ছেড়েছিলাম, যতকিছু সম্ভব বলার পর বলেছিলাম আসলে এরকম শুখনো প্রেম আমার পোষাচ্ছে না। আমি তোমাকে চাই, সর্বতো ভাবে চাই। সপ্তাহ খানেক গেল, ওই কাঁচা বয়সে যা হয়, অনেক গাগলামী করলাম, লোপাও কেমন যেন হয়ে উঠল। ভীত সন্ত্রস্ত দুর্বল আর মনমরা হয়ে রইল । আমার সাহস বাড়লো, আমি অভিনয় করে ওর উপরে আরেকটু চাপ সৃষ্টি করলাম। এসব ক্ষেত্রে কিংবা পড়ালেখার ক্ষেত্রে আমার মেধা আসলেও আমাকে চমকিত করে। ইংরেজীতে কখন যে কিভাবে এতো ভালো হয়ে উঠেছিলাম জানি না। তখন গড়গড় করে ইংরেজী বলতাম, আর এতে সুবিধা হলো কি যে অন্যেরা মুগ্ধ হয়ে যেত। আমি সেক্সপিয়ারের কিছু লাইন মুখস্ত বলতাম নাটকীয় ডংগীতে, শেলী, কিটস, বায়রনের কবিতার লাইন মুখস্ত বলতাম। বাড়ীতে সবাই বলতো, দুষ্টু ছেলেদের মেধা বেশীই থাকে । কারন দুষ্টমী করতেও তো বুদ্ধির প্রয়োজন। কিন্তু এই প্রেম পাগলামীর কথা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। গুঞ্জন কলেজ থেকে বাসায় এলো, বাসায়ও পরিবর্তন কারও চোখ এড়ালো না। কতো বকা ঝকা যে হলো, আমি অটল রইলাম বিয়ে আমি করবই এবং ওই লোপাকেই । লোপার বাবা অর্থ বিত্তশালী, খ্যাতি আছে তার। শোনার পর প্রথমে অগ্নিশর্মা হলো। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, মান সম্মানের ভয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো। মেয়ের কপাল, মেয়ের দুর্ভাগ্য বলে কোন রকমে মেনে নিল আর কি। গরিণত বয়সে এসে নিজের পিছনের কথা লিখছি তো তাই সংকোচহীন ভাবে লিখতে পারছি। তবে মেয়ের কপাল যে অতো মন্দ নয় যতো ভাবছে তারা সেটা সামান্য হলেও বুঝিয়ে ছিলাম। বি.এ. পরীক্ষায় ফাষ্ট ক্লাস পেয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলাম। আর লোপা কি যেন কেন পড়া লেখা ছেড়েই দিয়েছিল, পাশ করতে পারল না, নতুন করে ভর্তিও হলো না, বরং আমার অবিবেচনার কারণে সে মা হতে চললো বছর না যেতেই। আমি ইংরেজিতে মাষ্টার্স করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সন্তান এলো, ছেলে সন্তান। ক্লাস মেটেরা আমাকে ঘিরে গুঞ্জন করতো, অভিজ্ঞতা জানতে চাইত, কি করে এতো শৈশবে প্রেম ও বিয়ে হলো। কতো নিশ্চিত ও সুখী আমি অন্যের আলোকে । কিন্তু আমি তো হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলাম নিজের অবস্থান। মন প্রাণ দিয়ে লেখাপড়ায় ভালো করার চেষ্টা করছি, চেষ্টা করছি সংসারটাকেও টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু সংসার তো চলতে চায় না। না বাবার আপত্তিতে বিয়ে, সেই বাড়ীতে গিয়ে বউ কি করে মানিয়ে নিয়ে থাকবে, তাও গরীব ঘরের মেয়ে হলে একটা কথা ছিল। লোপা তাই বিয়ের পর এক দুইবার শ্বশুড় বাড়ী যাতায়াতের পর নিজের বাবার বাড়ীতেই রয়ে গেল, সন্তানও তার নানা নানিকেই চিনছে জানছে দাদা দাদীকে নয়। ছুটি হলে আমিও ছুটছি শশুর বাড়ী নিজের বাড়ীতে নয়। নিজের বাবা মা ক্রমশই সঙ্গত কারণেই ভুল বুঝছে, পর বা দূর হয়ে যাচ্ছে। আমার যে কি করার আছে সেটাই বুঝছি না। সন্তানের মায়ায় ছুটে যাই কিন্তু সেখানকার আদর আপ্যায়ন যে শিথিল হচ্ছে বুঝতে পারি। ছাত্র অবস্থায় কিছু টিউশনি করে কি এমন উপাহার দিতে পারি, ভরণপোষণ চালানোর তো প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু এই অপরাগতা আমি অন্যকে বুঝাই কি করে। অত্যন্ত অসহায় বোধ করতে থাকি। লোগা আমার এই অসহায় অবস্থাকে অযোগ্যতা বলে ধরে নেয়। ক্রমশ বড় বেশী মুখরা হয়ে উঠে লোপা। বলে, তুমি তো আগে থেকেই তোমার অবস্থার কথা জানতে। বেহায়ার মত নির্লজ্জের মত বড়লোক শশুড়ের ঘাড়ে বসে খাব, থাকবে, ভাগবে, এটাই ভেবেছিলে। বউকে ছেলেকে ভরণপোষণ করার ক্ষমতা রাখোনা তো এখানে আস কেন? র ওই প্রেমের পালা, প্রেমের জ্বালা বা উম্মতা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমার ভুত ভবিষ্যৎ সব শেষ করে দিয়েছ। আমার জীবন কি এ রকম হওয়ার কথা ছিল ? তুমিই আজ আমাকে ঘরে বসিয়ে রাখতে বাধ্য করেছ। এমন পরিবারের মেয়ের কি এমন হবার কথা ? তোমাকে পেতে গিয়ে মা বাবাকে দুঃখ দিয়েছি, কষ্ট দিয়েছি, মান সম্মানে আঘাত দিয়েছি। আর কতো চাও ? আমার সামান্য দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তুমি আমাকে যে বিপদে ফেলেছ, আর নতুন কোন বিপদ ডেকে এনো না। লোপার এ আচরণে আমি মোটেই বিস্মিত হইনি। এরকম অবস্থা যে আসবে সে তো বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু ওই সেই সময় উম্মাদনা আর পাগলামীর চুড়ান্ত পর্যায়ে তো আর এসবের জের ছিল না, জানা ছিল না প্রেম উড়ে যেতে এতো অল্প সময় লাগে । লোপা এখন অত্যন্ত বাস্তববাদী হয়ে উঠেছে। পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে ওদের বাড়ীতে না যেতে। তার সন্তান সে তার মনের মত করে মানুষ করবে। সেখানে যেন আমার ছায়া না পড়ে, ছায়া পড়লে অকাল কুষ্মান্ড, অকাল পক্ক ও বখাটে হবার আশঙ্কা রয়েছে। আমার প্রতিবাদ করার মুখ কোথায়? আমি অপমানিত হচ্ছি কিনা লোপা হয়ত একবারও তা ভেবে দেখেনি, কতোখানি কষ্ট পাচ্ছি, আহত হচ্ছি ভাবেনি। আমি লজ্জা পেতে পারি কাঁদতে পারি এমন কথা একবারও বুঝি ভাবেনি লোপা। লোপা অনেক বলেছে, সবই ন্যায্য তবু একটু হলেও যে অমানবিক সেটা ভাবেনি। আমি তো রক্ত মাংসেরই মানুষ, আর রক্ত যে একটু বেশী গরম সেটা লোপা জানে। মান সম্মান বোধ কতটুকু আছে না আছে জানিনা, ভুল করলাম নাকি ঠিক করলাম জানি না, আমি লোপার কাছে লোপাদের বাড়ীতে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। ছেলের জন্য দুর্বার একটা টান অনুভব করতাম, বুকের ভিতর কষ্টের মোচড় দিয়ে উঠত তবু জেদ বজায় রাখলাম । বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা আর শেষ হতে চায় না। একটা পেপার হলে অন্যটা পিছায়। ঠিক কি কারণে যেন পরীক্ষার সময় দৈব দুর্বিপাক, গোলযোগ দেখা দিয়েই থাকে। কতো দিন আর কার মাস যাবে ঠিক বোঝা যায় না। কতো জনের যে চাকরির বয়স সীমা শেষ হয়ে যায়, কতো খানের যে দিশাহারা অবস্থা হয় তার যদি কোন জরিপ হতো, সমাধানের কোন ব্যবস্থা হতো। তা যাই হোক দি ওই দিশাহারাদের একজন, আমার তো এমনিতেই ভাগা নৌকা, না আছে হাল, না আছে পাল, না আছে লগি,না আছে বৈঠা। আর তাই না আছে কুলের ইশারা, না আছে কিনারের আশা। আমি হঠাৎ করেই শেষ বর্ষের সব পেপার পরীক্ষা শেষ না করেই একট ইন্টার ভিউ দিয়ে ফেললাম। আর ক্স আমার জন্য যা হার ছিল তাইই হয়ে গেল। জীবন ধারা একদম বদলে গেল। পুলিশ সার্জেন্ট হয়ে মটর সাইকেলে প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলি। ট্রেনিং নিতে গিয়ে আর পরীক্ষা দিতে আসা হলো না, ইংরেজীতে ভালো সেটা দেখানোর আর কোন পথ থাকলো না, আমি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম না, লোপার বাবাকে বা লোপাকে একহাত দেখিয়ে দিতে পারলাম না, ফরেন সার্ভিস বা সিভিল সার্ভিস পেয়ে। পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর হলাম। যে কোন কাজ পেলে শিখে নিতে আমার সময় লাগে না। আর কাজের দক্ষতা দেখানোও মোটে কোন ব্যাপার নয় আমার কাছে। আমি সুনাম করলাম, কাঁচা পয়সা হাতে আসাও কঠিন হলোনা, কিন্তু লোপার পরিবারে একেবারে ঘৃণার পাত্র হয়ে গেলাম। ছেলেটার সাথে দেখা করাও বন্দ হয়ে গেল। স্কুলে ওরা কেউ না কেউ সাথে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। বাসায় ছেলের জন্য শিক্ষক আসে, শুনেছি লোপার জন্যও আসে, লোপা প্রাইভেটে বি.এ. পরীক্ষা দিবে, এম. এ. পাশ করবে, বাবার ফার্মে চাকুরী করে আমাকে জব্দ করবে। আমি তো আসলে জন্ম হয়েই আছি। ছেলেকে ইংরেজী শেখানোর জন্য অন্য মাষ্টার, আমি বাবা হয়ে সেটার অধিকার নাই। তা যাক গে, আমি তো নিজের অযোগ্যতাতেই সব হারিয়েছি। ভালোই প্রতাপ আমার আমার সার্কেলে, বেশ কিছু তাবেদার জুটে গেল, মৌমাছির মত গুঞ্জন শোনাল, প্রজাপতিয় রং লাগলো মনে, ঘটক এলো ছবির এ্যালবাম নিয়ে, মাইক্রোধিপ দিয়ে, নানে, ছবিকে গড় করে করে খুটিয়ে খুটিয়ে কয়েক রাত ধরে দেখলাম। সাথের সাথীরাও এক সাে এ্যাঙ্গেল থেকে দেখলো, ঠাট্টা তামাসা হলো, রাতে ওই সব ছবি মেয়েরা নায়িকা হয়ে আসতে থাকলো, দেরী সইলো না, বিয়ে করে ফেললাম বি.এ পাশ (প্রাইভেট কলেজ থেকে) চটকদার এক মেয়েকে। গুলিশ অফিসার আমি, আমি থোয়াই তোয়াক্কা করি কাউকে। বিউটিকে নিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াই। বিউটির অভিভাবকরা বলেছিল প্রথম স্ত্রীর মতামত নিতে, যেটা নিয়ম আর কি, কিন্তু ওই যে বললাম আমি মোটে পাত্তাই দেইনি সে কথাকে। কোন গুরুত্বই দেই নি। অনেকেই বলেছে, লোপার বাবা কিংবা লোপা ইচ্ছা করলে তোমার নামে কেস করতে পারে। কিন্তু কি যেন কেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। মনে হয়, আমার প্রতি লোগার এতোটাই ঘৃণা জনেছিল যে কেস করতেও ঘৃণা বোধ করেছিল বোধ হয়। বিউটিকে নিয়ে হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে কাটালেও মাঝে মাঝেই লোপার কথা বড় বেশী ম হতো। হয়তো এই টানকেই প্রথম প্রেম বলে। মনে মনে লোপার ভদ্রতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। বিউটি আনাকে তার ১টি ঠকম দিয়ে, তার অত্যাধুনীকতা দিয়ে সারাক্ষণই মুগ্ধ রাখতো। অফিস ও বাসা সর্বত্রই ছিল আমার ব্যস্ত চলাচল। নতুন ডিজাইনের জামা, টি সার্ট, জিনস, গহনা কিসে যে তার শেষ টান দিবে সেটা বুঝতে না। আবদার আহ্লাদ লেগেই আছে, ভালোই লাগতো, চোখের কটাক্ষ, ইশারা ইঙ্গিত, মেহেদী নকশার হাত, নুপুর বাঁধা পায়ের ছুমছুন, অহেতুক কাকলী মুখর কথা, বেসুরো গানের কলি। কতো কতো যে আব্দার, রাতদিন এটা ওটা সেটা। পার্লারে গিয়ে বন্ধু জুটলো বিউটির, সকাল ভ্রমনের বন্ধু জুটলো বিউটির, হৈ হুল্লোড় আড্ডাবাজি লেগেই রইল তার, ঘরে বাইরে। ঘরে সময় দেবার তেমন সময় তার নেই। উরু উরু মন সদা চঞ্চল, শুধু চাওয়া আর পাওয়া। এই ভাবেই চলছিল, কিন্তু বছর তিনেক পরেই কেমন যেন মিটমিট মিটমিট সব সময়। সন্তান গর্ভে এলো, তাতেও তার আপত্তি আর ভালো না লাগার প্রকাশ। বলে উঠেছিল, এতো তাড়াতাড়ি কেন যে বাঁধা পড়ে গেলাম, আর ক'বছর গেলে ভালো হতো, জীবনকে উপভোগ করাই হলো না। যাক, নিজের কথায় ফিরি, বিউটি আমাকে আর আগের মত টানতে পারছিল না কারণ ওর চিন্তাগুলো একেবারেই বাহির মুখী আর কি ভীষণ যে পার্থক্য লোপার সাথে। এর শুধু দাও দাও দাও আর লোপাকে দিতে চাইলেও কিছু নিলো না। আমি তেমন রইলাম না, হয়ে গেলাম বিউটির যোগানদার। কিন্তু সে আমাকে সন্দেহ করতে থাকলো, লোপার সাথে সম্পর্ক রয়েছে সে তো বটেই অন্যদের জড়িয়েও নানা কথা বলতে থাকলো। আমাকে ভয় দেখালো এই বলে যে বড় বউয়ের সম্মতি ছাড়া তাকে বিয়ে করেছ, সে নাকি নিজেই সেই কেস করবে। কেমন করে বিপদে ফেলবে। তবে বিপন আমি এমনিতেই পড়েছিলাম, ডিপার্টমেন্টের তদন্ত কমিটি আমাকে দোষী সাব্যস্থ্য করন, আমি সাসপেন্ড হয়ে গেলাম। প্রথমে সাসপেন্ড তারপর ডিটেনশন হয়ে গেলাম। বাড়ীতে মা বাবা বয়ঃবৃদ্ধ, তাদের প্রতি যত্ন নিয়েছি সে কথা আমার প্রতি আমার শরও বলবে না, কিন্তু আমার এ দুর্যোগে সেখানে ছাড়া আমার আর গতি কোথায়। হাজার হলেও ছেলে তো, তারা ফেলতে পারলেন না, বুকে টেনে নিলেন, আর বুকে থাকা দিয়ে সরে গেল বিউটি। শুনলাম সে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। কারও সাথে, নাকি একা, সে খানিতে ইচ্ছো হয়নি যোটে। তবে এখনও জানতে ইচ্ছা করে সন্তানটিকে সে পৃথিবীর আলোতে এনেছিল নাকি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছিল। বাড়ীতে নিজের ইমেজ ক্ষুন্ন থাকলেও গ্রাম সেটা ফিরিয়ে আনতে তেমন কষ্ট হলো না। গ্রামের লোকে জানলো বিউটি ভালো না থাকায় পালিয়ে গেছে, বিউটির কারণেই তার চাকুরী গেছে, গ্রামের সবাই এত জানে যে সে এম এ পাশ করেছে। সে ইংরেজীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল, অর্থ্যাৎ ইংরেজী এম, এ এতো তাদের জন্য বিশ্বাস করা খুবই সহজ। তার দাম গ্রামে মোটে কমেনি বরং পেড়ে গেল। সকাল বিকাল লোকজন আসে, কথা বার্তা হয়, ভালোই কাটে কিন্তু এসবে বসে থাকাতো "আমার নেচারে নাই, হাঁপিয়ে উঠলাম। কোন রকম ব্যবসা যে আমাকে দিয়ে হবে না সে সবই বুঝছিল, আমি বুঝছিলাম। সরকারী চাকুররী কোন বয়স নেই আর পাওয়ার যোগ্যতাও নেই সে তো আমি জানি। কিন্তু অন্যেরা এমন সম্মান দেয় যেন আমি বিরাট এক কর্মদক্ষ অফিসার। আপাতত: ভাগ্যেদোষে বিপাকে আছি। তাই বিনয়ের সাথে দল বেঁধে তারা আসে অনুরোধ করে যেন তাদের কথা তামি আপাতত: রাখি। আমি আনার ধূর্ততা দিয়ে সবকিছু দিব্যি ম্যানেজ করে নেই । শুয়া আমাকে হাতীর বোরকারী কলেজের পলিং বডির সদস্য করে। ছোট একটা কালনা, সব ছিলাম, অনি নেই পার্ভানিং বডির সদস্য কিন্তু আমি প্রতিদিন ক্লাস নোনা ইচ্ছে করেই, এত বুঝি আমি সকল ক্লাস নেই । এ কলেজের সবাই সুনাম করে, ওদের ইচ্ছা বর্তমানে অধ্যক্ষের মেয়াদ শেষ হলে আমাকেই অধ্যক্ষ করবে। আমি এখন অনেক বদলেছি, আমি প্রকৃতি দেখি, ছেলের কথা ভাবি, লোগার কথা ভাবি, কিন্তু কি এক অশুভ শক্তি যে আমার পিছনে লেগে থাকে বাইরের ঝড় বাদল আমাকে স্পর্শ করে, নিজের মধ্যে দাপাদাপি করে জীবনের গত দিনগুলো। এর মধ্যে এই ছোট কক্ষ ছেড়ে অধ্যক্ষের বড় কঙ্কটাও আমাকে টানে, প্রলোভন দেখায় । বিবেক তখন মোটেই মাথা তোলে না। যখন অধ্যক্ষের মেয়ের দিকে লোভাতুর দৃষ্টি ফেলি। তখন লোপা—বিউটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
Read Also :-
Labels : #Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#অচিন মন ,
Getting Info...

Post a Comment