ও কি মায়া

অনামিকা হক লিলি (প্রফেসর বেগম গুলবাহার)
অধ্যক্ষ, সরকারী বিজ্ঞান কলেজ, ঢাকা ।
ইলা তুই শুনছিস তো, ইলা এই ইলা, তোকে "কিছু শৌ মানে, কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা। লিপি এমন ভাবে কথাগুলো বলে মনে হয় যেন ফোনে কথা বলছে। ২০০২ ইলা বলে, আমি তো তোর সামনেই বসে আছি, অতো জোরে চেচাচ্ছিস কেন বলতো? এই শ্রাবন দুপুরের মত, রিমঝিম রিমঝিম বরিষনের মত মিষ্টি করে বলতে পারিস না? বলতে পারি কিনা তুই জানিস না? বৃষ্টির শিহরন তোকে কে বুঝিয়েছিল বল? বৃষ্টিযে কথার ঝুড়ি নিয়ে আসে সে কি আমি তোকে বুঝাই নি? আর তুই বলতি বৃষ্টি নিয়ে আসে ভীসন কান্না, দুই চোখা ভরে আকুল করা কান্না শ্রাবনের ধারার মতই। তখন তুই মাত্র ক্লাস এইটে পড়তি, কিন্তু তুই বড় বেশী কান্নার কথা বলতি । লিপি তুই জানিস না কেন কাঁদতাম, কেন কান্নার কথা বলতাম? সেই ছোট বেলা থেকে যে আপন মায়ের স্বাদ না পায়, আমাদের গ্রামে কি বলে জানিস না? মা মারা গেলে বাপ হয় তালুই। সৎ মা ঘরে আসলে বাপ কি হয় সে প্রবাদটা অবশ্য আমার জানা নেই। তবে চোখের পানির হিসাব থাকে না সেটা তখন থেকেই জানি। আর ওই যে বললি আমাকে কথা শোনাতে তোর কষ্ট হয়, বার বার বলতে হয়, সে অভ্যেসটাও ওই ছোটতেই হয়েছে। বাড়ীতে তখন অনেক বেশী কথা হতো যা থাকতো না শোনারই মত। কেন আমি সময় পেলেই তোদের এখানে ছুটে আসতাম বুঝতি না? তোর সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্বতো বটেই তাছাড়াও তোর মায়ের কতাগুলো শুনতে। মায়ের আদর কাকে বলে শুনতাম, বুঝতাম, বুভুক্ষুর মতো তাকিয়ে থাকতাম, তোকে বলা কথাগুলো। লিপির চোখও ছলছল হয়ে উঠে। বলে, রাখতো রাখ তো ওসব কথা। এতোদিন পরে দেশে এসেছিস, তাও শুধু কান্নার কথাই বলবি? এসেছিস তো ভরা শ্রাবনে, শ্রাবনের আকাশের মত শুধু কাঁদতেই এসেছিস। আমি ভাবলাম তোকে নিয়ে মধুর স্মৃতি রোমন্থন করব, আর সেই জন্যই বললাম রিমঝিম করে ঝিমঝিম করে কথা বল। আমরা ফিরে যাই কৈশোরের সেই নতুন আবিস্কারের শিহরণে। সেই কবে থেকে বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করব বলে মা'র কাছে বায়না ছিল। মা কি বলেছিল তাতো তুই শুনেছিলি । ইলা বলে, আমার দিব্যি মনে আছে, বলেছিলেন ছুটির দিন হতে হবে, বৃষ্টিকে দুপুরে নামতে হবে, সন্ধায় কিংবা বেলাগড়ানো বৃষ্টিতে হবে না, আবার সকালের বৃষ্টিতেও হবে না। শিলা ইত্যাদি। হবে না, ঠিক বলেছিস, সেই কবে থেকে তুই আর আমি অপেক্ষা করে থেকে থেকে সেবার আষাঢ়ে একদিন ঠিকমত পেয়েও নামিনি তুই ছিলি না বলে, তারপর শ্রাবনে ঠিক ঠিক পেয়ে গেলাম। তুইও সকাল থেকেই আমাদের বাসায়। আমরা বাংলা পড়লাম, ইংরেজী পড়লাম আর বার বার আকাশের দিকে তাকালাম। কারণ আকাশে সেদিন সকাল থেকেই মেঘ জুড়ে ছিল, গুড়গুড় শব্দ যেন আমাদের প্রত্যাশার আশা দিচ্ছিল। বেলা এগারটার দিকে শুরু হলো টিপটিপ, তোর আমার চোখাচোখি হল খুশীর আলোকে। ইলা, আয় অংক নিয়ে বসি, আনন্দে ঠিক ঠিক মিলে যাবে, সত্যিই কিন্তু মিলেখাছিল তাই না? একটা করে মেঘের গুড়ুম আর তুই ভুল করছিলি। সাধারণ যোগ করতে, সিঁড়ি ভাঙ্গা আর সরল অংক ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছিল, একে যাদি মিলে যাওয়া বলে তবে মিলে যাচ্ছিল। লিপি বলে, আসলে কিছুই মিলছিল না বার বার আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে অংক খাতায় বড় বেশী ভুল হচ্ছিল শেষে আমরা ছবি আঁকা ধরলাম । সেটা কিন্তু ভালোই হচ্ছিল। আমি ধরলাম শ্রাবনের আকাশ আর তুই ধরলি শ্রাবনের বৃষ্টিধারা, গ্রামের বাড়ীতে। তোরটা তুই চোখ বুজে বুজে ভেবে ভেবে কষ্ট করে আঁকতে হচ্ছিল। এরমধ্যেই খুব জোরে একটা বিদ্যুতের চমক আর একটু পরেই বজ্রপাত। ভীষন রকম ভয়ে খাতা পেন্সিল কালির দোয়াত উল্টে ফেলে আমরা একে অন্যকে জাপটে ধরলাম। একেবারে চোখ বন্ধ করে ধরে থাকলাম। মনে হচ্ছিল আমরা এক অন্যের আবলম্বন ছাড়লেই বুঝি শেষ হয়ে যাব। ঘটলও তাই, যেই ছেড়েছি আবার একটা গর্জন, এবার জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলাম। আম্মাও ছুটে এসেছেন রান্নাঘর থেকে, আর তক্ষুনী শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি, অনেক অনেক বৃষ্টি। বিদ্যুৎ চমক চলে গেল, শুধুই বৃষ্টি। প্রথম দিকে এলোমেলো একটু বাতাসের সাথে তারপর গাছের ডালে, টিনের চালে, মাঠের ঘাসে অবিশ্রাম বৃষ্টি। ঠিক আমাদের গোসলের সময়, তারপর ছুটির দিন। বৃষ্টিতে ভেজার কথা আম্মাকে বলব বলব করছি এর মধ্যেই আম্মা বললেন, কিরে তোরা তেল মাখানো মুড়ি খাবি নাকি? আম্মার আদর মাখানো কথা শুনেই সুযোগটা নিয়ে নিলাম। ভাগ্যিস যে তুই ছিলি সেদিন নাহলে মঞ্জুর হতো না। আমরা দুজন যত দ্রুত সম্ভাব টেপ জামা আর ছোট প্যান্ট পড়ে দৌড় দিলাম। আম্মা বললেন আস্তে যাও পড়ে যাবে, আর বেশীক্ষন ভিজবে না, উঠানেই থাকবে, বাগানে ঘাসের মধ্যে যেও না। শেষে ৩ ব্যাঙ দেখে জোঁক দেখে কেঁচো দেখে ভয় পাবে। দৌড়ের মধ্যেই বললাম ঠিক আছে। কতদিনের যে প্রতিক্ষা! শিলা বৃষ্টি নাই, তাহলেও তো হতোই না। উঠানে নেমে কিছুক্ষন ঠিক বুঝলাম না আসলে কিভাবে কি করব। শুধুই লাফাব আর হাত পা ছুড়ব, পানি ধরব, মুখে দেব। উঠানের এমাথা থেকে ওমাথা দৌড়ানো শুরু করলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম বৃষ্টি যেন না থামে যেন আরও জোরে নামে। বৃষ্টি আরও অন্ধকার হয়ে নামল। আমরা দুজন হাত ধরাধরি করে কত যে কবিতা আর ছড়া বললাম! কিন্তু বাগান যেন ইশারায় আমাদের ডাকছিল। কত ফুল যে পড়ে আছে, ভিজে ভিজে ফুল কুড়ানোর আনন্দ নিশ্চয়ই অনেক বেশী আনন্দের। ছুটে গেলাম গাছ তলায়। তাকিয়ে দেখি জামা গায়ে একেবারে লেপ্টে গেছে। বৃষ্টির বড় ফোঁটা বুকে পিঠে পেয়ে কি যে ভাল লাগছিল, শিহরনে কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম, এ কোন ভাললাগা ! তোর লম্বা চুলগুলো ভাগ করে বুকের উপরে রাখছিলি আর আমার ববকাট চুলে সেটা সম্ভব হচ্ছিল না বলে একটু লজ্জা করছিল। এই বৃষ্টি আমাকে এই ব্যাপারে প্রথম লজ্জা শিখালো। দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে আম্মার গামছাটা নিয়ে এলাম। আম্মা বললেন আর ভিজো না সর্দি জ্বর হবে উঠে এসো। তুইও পিছে পিছে এসেছিলি, বললি, খালাম্মা আর অল্পক্ষন। তোর জন্যই আরেকটু সময় পেয়েছিলাম। ঘাসের ভিতর ছপছপে পানি, পায়ের পাতা ডুবে যেয়ে আরেকটু বেশী, তুইই হঠাৎ বললি, একটা মাছ, মাছ। আম্মা দূর থেকে বললেন, তাই নাকি? কি মাছ রে? বললাম গোল মাছ নয়ত টাকি। তুই ধরার জন্য মাছটাকে তাক করে পিছু পিছু যাচ্ছিলি, একসময় গামছাটা একটানে আমার বুক থেকে নিয়ে মাছটাকে ঢেকে দিয়ে চেপে ধরলি। বললি গামছার চারদিক চেপে ধরে রাখ নয়ত মাছটা পালাবে। তুই মাছটাকে একবার করে ধরেছিলি আর ছাড়ছিলি, ভয়ে ভয়ে বলেছিলি আমি গামছা চেপে ধরি তুই মাছটা ধরে থাক। আমি তো মাছটা একটু ধরতে না ধরতেই দিলাম এক চিৎকার। আম্মা ছুটে এলেন ভেবেছেন বুঝি সাপ দেখেছি। কেন যে চিৎকার দিয়েছিলাম, কি রকম যেন ভয় মাখানো কাঁপন। পরে এ নিয়ে আমাদের দুজনের অনেক গল্প অনেক, হাঁসি তামাশা হয়েছে। সেদিন দুপুরে গোলের ভর্তাটা খুবই মজা হয়েছিল। ইলা বলে, ভোর আম্মা আমার লম্বা চুলগুলো গামছা দিয়ে ঘষে মনে মুছিয়ে দিয়েছিলেন, আমার চোখে তখন আবার ধারা নেমেছিল। মায়ের আদরের স্পর্শে যে এতো সুখ। কান্নায়যে এতো সুখ। উনি আমাকে সেদিন প্লেটে খিঁচুড়ি তুলে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন খাওয়া হলে তোমরা একটু ঘুমিয়ে নাও, ভয় হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজেছ জ্বর না হয়। এক বিছানায় এক চাদরের নিচে দুই বন্ধু শুয়ে শুয়ে গল্পের পর গল্প হচ্ছিল। আসলে ওই বয়সে কতো কি যে বলার থাকে। তারপর একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সত্যিই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। আশষ্কায় আম্মা কপালে হাত রেখেছিলেন, ডেকেছিলেন বার বার ঘুম (ব্রাঙ্গছিল না, শেষে মুড়ির সাথে ডালের বড়ার সুগন্ধে লাফিয়ে উঠেছিলাম। আমরা তখনও গলায় গলায় কোমরে কোমর জড়ানো ছিলাম। সেদিনের শোয়াটাও কিন্তু আমরা কেউই ভুলতে পারিনি । ইলা দেখ আজকেও আবার ঠিক সেরকমই বৃষ্টি তাই না? আচ্ছা ইলা বলত, তোদের ওই আমেরিকায় কখনও কি শ্রাবন আর আষাঢ়ের রূপ দেখতে পাস? ওখানে কি এমন গান আছে? আষঢ়, শ্রাবন মানে নাতো মন', 'মেঘের ডম্বরু খন বাজে রিমঝিম ঝিম রিম ঝিম মনদেয়া বরখে, কিংবা একান্তে নিবিড় গভীর থেকে উত্থিত হয় সেই বানী সেই কথা— এমন দিনে তারে বলা যায়। কিংবা ধর প্রেমিক যুগলে যাচ্ছে, ছিপছিপে বৃষ্টি, ভয়ে ভয়ে একে অন্যের হাতটা ধরেছে, মেয়েটির অধরে বৃষ্টির ফোটা যেন মুক্ত, ছেলেটির ইচ্ছে ঠোট দিয়ে ওটা শুষে নেয়, লোকলজ্জার ভয়ে পারছে না কিন্তু বার বার তাকাছে, মেয়েটির মুখ পায়ের দিকে, কারণ চেনা কাউকে দেখে লজ্জা পেতে চায় না। ইলা বলে, কি যে বলিস না আবল তাবল। ওই সুদূরে আষাঢ়ের ঘনঘটা শ্রাবনের উচ্ছাস ভাদ্রের টইটম্বুর নদী, আশ্বিনের শিউলি ফুলের কমলা বোটায় বিন্দু বিন্দু শিশির, দূর্বা ঘাসে সূর্যপ্রভায় হিরকের দ্যুতি! তোকে কি করে বুঝাব বল? যদি আমেরিকায় বসে এসব দেখতাম, পেতাম তাহলে কিসের তৃষ্ণায় দুই এক বছর পরপর সুযোগপেলেই চলে আসি বল? ওখানে প্রেমতো অবশ্যই আছে, প্রেম ভালোবাসা না থাকলে পৃথিবী চলছে কি ভাবে? কিন্তু সে প্রেমে প্রথম স্পর্শের শিহরণ আছে কিনা জানিনা, একটু চুম্বনের জন্য দীর্ঘ প্রতিক্ষা আছে বলে শুনিনা, বৃষ্টি সিক্ত বসনের স্বলজ্জা চাহনি আমি দেখিনি। ভিজা বকুলের মালা খোপায় পরাতে দেখিনি । ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে, অত দেখিনি দেখিনি করিস নাতো, কি দেখিস তাই বল না। যা দেখি সে আমি বলতে পারব না রে, ওসব আমার সহ্য হয়— না। বরং তুই যে প্রথমে স্মৃতি রোমন্থন চাইছিলি তাইই করি। বৃষ্টিতে ভেজা অন্যরকম অভিজ্ঞতার সেই দিনটির কথা, যা তোকে আগেও আমার বহুবার বলেছি, তবুও বার বারই গায়ে কাটা দেয়, বার বারই রক্তিম হয়ে উঠি ভাবতে ভাবতে । তুই থাম, বরং আমিই বলি, কম বেশী কিংবা ভুল হলে শুধরে দিস। লিপি বলতে শুরু করে, সজোরে বৃষ্টি হচ্ছিল, তুই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবি বলে ষ্টান্ডে দাড়িয়েছিলি। বাসা থেকে আসতে একটু দেরী হওয়ায় নির্দিষ্ঠ বাসটি চলে গিয়েছিল, আর এর মধ্যেই নেমেছিল ঝুম বৃষ্টি। সকাল সাড়ে আট, কোন দোকন পাট খোলেনি, সহজে খুলবে বলেও মনে হচ্ছে না, এই বৃষ্টিতে কেই বা আসবে। বন্ধ বন্ধদোকানের বারান্দায় বৃষ্টি বাঁচিয়ে গুটিসুটি দাড়িয়েছিলি। পথচারি কেউ কেউ যে দাঁড়িয়ে ছিল না তা না, তারা কথা বলছিল, ধোঁয়া উড়াচ্ছিল, তোর মত মেয়ে তুই একা। দুরন্ত বৃষ্টি বাতাসের ঝাপটা সাথে এনে তোকে স্পর্শ করাছিল বার বার। তোর চূর্ন কুণ্ডল ললাটে অধরে তুই ছিলি সিক্ত নিলাম্বরী। অত্যন্ত অস্বস্থি নিয়ে ভাবছিলি সবাই বুঝি তোর দিকে তাকিয়ে আছে। ফিরে যাবার প্রশ্নই উঠেনা, আরও বৃষ্টিতে আসতে হবে তাছাড়া পরীক্ষাতো রয়েইছে, ওটা দিতেই হবে। বাস আসতে দেরী হচ্ছে, উপায় নেই, বুক ফেটে তোর কান্না আসছে। কি রে ঠিক বলছি তো? লিপি জিজ্ঞাসা করে। ইলা বলে, ঠিক বলছিস, একেবারে হান্ড্রেড পারসেন্ট, কিন্তু বলত, এখন এ রকম অবস্থা হলে কি হতো? কি আর হতো, বেশ কজন লোভ চকচকে চোখে তাকাতে তাকাতে হামলে পড়ত। একজন নায়ক আসলেও কি আসত? যেমন নাটক সিনেমায় আসে। না তা আসত না, ভালোলোকগুলো, দেখেও না দেখতো কিংবা সরে পড়ত। কিন্তু আমাকে বাধা দিস না তো, বলতে দে, সেই রোমাঞ্চকর সময়ের কথা, উঃ যতবার ভাবি ততবারই কেঁপে কেঁপে উঠি। খালি রিক্সাটা তুই ও ডাকলি সেও ডাকলো। কি যেন নামটা, ওটাতো তোর হৃদয়ে গাঁথা। ধরে নেই শ্রাবন। রিক্সা থামতেই শ্রাবন পা বাড়ালো সেই সাথে তুই। শ্রাবন থমকালো কিন্তু এগিয়ে বলল চলুন। তুই সুবোধ বালিকার মত উঠে পড়লি, উঠল শ্রাবন । অন্যরা হয়ত ভেবেছিল তুই ওর সাথেরই লোক। কিন্তু তুইতো জানতি শ্রাবন তোর চেনা কেউ নয় তবু উঠলি কেন রে? প্রশ্ন করবি না, তুই জানিস না, সব কেন যে কেন হয় তার সবগুলোর যে উত্তর পাওয়া যায়না। কেন যে গুটিগুটি পায়ে উঠে বসেছিলাম, আজও সে উত্তর পাইনি। তবে একটু পেয়েছি সেই দিনটিকে স্মৃতির কোঠোরে রাখতে, ভেবে ভেবে রোমাঞ্চিত হতে, হয়ত বা এজন্যই গিয়েছিলাম। ফিসফিস করে বলে সারাজীবন কাঁদব বলে । লিপি বলে, তুই কি সবটুকু আমাকে বলেছিলি নাকি কিছু রেখে বলেছিস। অচেনা যুবক সে যে কালেরই হোক যুবকতো। বলেছিলি তোরা ঝুম ঝুম ভিজছিলি কিন্তু হুড তুলিসনি। শ্রাবন দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তুই বাধা দিয়েছিলি। বলেছিলি হুড দিলে বড় বেশী কাছাকাছি হয়ে যাবি, অন্যের চোখের আড়াল হতে ভয় করছিল তোর। কিন্তু তুই নিজেই যে ওর হাত চেপে ধরলি। তুই কি চমকে ছিলি, কি করলি ভেবে? নাকি অন্য রকম সুখে বিভোর হয়ে গেলি। প্রথম স্পর্শ, শ্রাবনের ঘনঘটা, ——। তারপর কি কথা যেন হয়েছিল, আগে কে? তুই কি হাত ধরে ফেলে দুঃখিত বলেছিলি, কতক্ষন ধরেছিলি রে? নিতম্বে বাহুতে নিশ্চয়ই ধাক্কা খাচ্ছিলি বার বার, হুড না তুললেই তো আর রিক্সা বড় হয়ে যায় না? লিপি বকবক করছে কিন্তু ইলা নিবিষ্ট তার নিজের গভীরে। ইলা মৌনতার ভিতরে চলছিল উম্ম রক্তের দ্রুত চলাচল। সে কত বছর আগের কথা, এতটুকু ম্লান হয়নি। ছাইরংয়ের সার্ট যেন আষাঢ়ের আকাশ। বৃষ্টির কলধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল ইলা, শ্রাবন বলেছিল, পথ কিন্তু দীর্ঘ কথা না বললে দীর্ঘতম হবে, তুমি ইলা আমি জানি, আমি ———। ইলা বলে উঠেছিল তুমি শ্রাবন আমি মানে আমি শ্রাবন, বিস্ময় কাটিয়ে তক্ষুনী মেনে নিয়ে প্রবল হাসিতে ফেটে পড়েছিল। বিদ্যুৎ চমকে গিয়েছিল, গুমগুম করে উঠেছিল আকাশ মেঘের গর্জেনের সময়ে আবারও হাত চেপে ধরেছিল ইলা। ধরেই ছেড়ে দিয়েছিল তক্ষুনী। আবার হাসিতে বাতাস মাতিয়ে তুলেছিল শ্রাবন। হাসি এতো সুন্দর এতো প্রাণখোলা এতো উদাও হয় কিভাবে। ইলা বিস্মিত হয়ে মুখের দিকে তাকায়। একবারে কাজল কালো চোখ। শ্রাবন কি কাজল এঁকেছে? সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আরেকবার তাকায় ইলা, এবারও চোখাচোখি। শ্রাবন বলেছিল, চোখ নামিয়ে নিও না, তোমার বৃষ্টিভেজা চোখদুটো ভারি সুন্দর। ইলা বলেছিল, তোমার চোখ দুটো বেশী সুন্দর, কাজল আঁকা। শ্রাবন কিছুক্ষন চুপ করে থেকে চোখ দুটো আলতো করে বন্ধ করে ছিল। দুফোটা পানি গড়িয়েছিল, ইলা ভেবেছিল বুঝি বৃষ্টির । কিন্তু সে পানির ফোটাগুলো ছিল নোনা। কারণ আবার চোখ তুলে যখন তাকিয়েছিল সে চোখ ছিল লাল, কান্না চাপতে গিয়ে বরং উপচে উঠছিল সে কান্না। কি বলবে কি করবে বুঝতে পারছিল না ইলা, সে কি কোন ভুল করে ফেলেছে, তার চোখের প্রশংসা ছাড়া আর তো কোন কথাই হয়নি। তবে কি তার ক্ষমা চাওয়া উচিত? এমন কথা ভাবার আগেই আবারও হাত ধরে ছিল ইলা, বলেছিল কিছু বলে থাকলে আমি দুঃখিত। শ্রাবন বলেছিল, দুঃখ সে তো শুধু আমার, শুধুই আমার। কদিন পর কেউ বলবে না আমি সুন্দর, আমার চোখ সুন্দর, বরং এই সুন্দর পৃথিবীটা আমি দুচোখ ভরে দেখে নিচ্ছি। প্রতিদিন দেখি, দুচোখ ভরে দেখি, আজ তোমাকে দেখলাম, অপূর্ব তুমি, অপূর্ব তোমার মন। আমার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে গেলেও মনের দৃষ্টি দিয়ে আমি তখন সব রোমন্থন করব। ক্রমশই কম দেখছি তারপর সব আলো চলে যাবে, আমার চোখের প্রেণার আমাকে অন্ধ করে ফেলবে। কি বলছ এসব? আমি নয় ডাক্তার বলেছে। ইলার ইচ্ছে হলো, ধরাহাত দুটো না ছেড়ে বরং বলতে, আমি তো রয়েছি, আমার এ দুটো হাত তোমায় সূর্যোদয় দেখাবে, ফুলের পেলবতা বোঝাবে, রংধনুর সাতরং তুমি আমার মাঝেই পাবে। লিপি চিৎকার করে ইলাকে বকুনি দিয়ে বলে উঠে, এটুকুতো কোনদিন বলিসনি? কোথায় কোথায় তোর শ্রাবন? এখন কোথায়? তখন চিকিৎসা ছিল কিনা জানিনা কিন্তু এখনও কি নেই? ওই হাত ধরা শোনার পর আর কি শুনতে চেয়েছিস? নিজের মতই প্রেমের গল্প ফেঁদেছিস। আমি মৃদু হেসেছি। তুই সত্য ভেবেছিস। কিন্তু আমার সে হাসি ছিল কান্না লুকানোর আশ্রয়। আমি ওই বাসষ্টান্ডেই দাড়াতাম রোজ। ততদিন দাঁড়িয়েছি যতদিন না চলে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে। কোন দিন আর শ্রাবনকে দেখিনি। তবে কি সবই মিথ্যে ছিল? অমন ঘটনা আসলে ঘটেইনি। কিন্তু সে যে বার বার ফিরে ফিরে আসে আমার অবসরে সে নিয়ে নেয়, নির্ঘুম রাতে বিদেশে বরফের চাদরে সে বৃষ্টি ঝরায়, তুষার তখন আমার হৃদয়ে শ্রাবন হয়ে ঝরে। আমি ওই সজল কাজল চোখে চোখ রাখবে বলে দেশে আসার দিন গুনি। আমি আজও তাই শ্রাবনেই আসি শ্রাবনকে দেখতে পাব বলে। শ্রাবন তুমি তো আষাঢ়ের পর ফিরে ফিরে আস বছর বছর আমার শ্রাবন কোথা পাই। লিপির মুখরতা স্তব্দ হয়ে যায়, আজকের এই বর্ষন। সেদিনের কান্নাকে বিচুর্ন করতে চায় তাতে আরও ব্যাপ্তি পায় ।