ইলেকশনের ঢেউ

ইলেকশনের ঢেউ

 ইলেকশনের ঢেউ

ইলেকশনের ঢেউ


অনামিকা হক লিলি


ওর নাম হুরি,আসলে ও হুরি পরির মতোই সুন্দর। যদি ওর মা বাবা কোনওদিন হুরী দেখেনি পরিও দেখেননি।অবশ্য কেউ দেখেনি হুঁড়ি পরীর রূপের কথা,তা।গ্রাম বন্দর শহর নগর সর্বত্রই সবাই জানে। সেই জানা থেকেইঅত্যন্ত আদরের নাম রেখেছিল হুরি,ফজল তাঁর ঘরে মেয়ে আশাতে এতোটুকু মন ছোটো করেনি।এতটুকুও অখুশিহয়নি।স্ত্রী কমেলা কুলার তুষ ভরা চাল নিয়ে বাঁ হাতে তৃপ্ত। টোকা দিয়ে দিয়ে ঝাড়ে আর ঢেঁকিতে পার দেয়ার বৌদিদের বলে।আমার হুরি কেমন উড়ে বেড়ায়?দেখেছ,পাড়ার বোঝই রা সবাই অবশ্য হরির সুন্দর জ্বর ব্যাপারে একমত।অন্তত তাদের জানামতে এ গ্রামে কেন আশেপাশের চৌদ্দগ্রামের ওহ হুড়ি মতো সুন্দর আর দ্বিতীয় মেয়ে নাই। ফলে তাইতো ক মেলাকেও ঠাট্টা করে বলে।কমলা তুমি এই হুরি কে কোথা থেকে আনলে?আমি তো তেমন সুন্দর না।আর তুমিও সুন্দর কিন্তু এ রকম তো না। একেবারে ফুটফুটে চাঁদের মতো হুঁরি।ফজল আর কমলার সংসারের অভাব নেই। বরং বলা চলে স্বচ্ছ একটাই মেয়ে হুরি এত এক আশ্চর্য চাষির ঘর তেমন লেখাপড়া নেই। অথচ সন্তানও বাড় তিনি।কমলার মনে মনে এ কটা ছেলের শখ থাকতে পারে।কিন্তু ফজল বলে আমার নেই। এই মেয়েই যথেষ্ট।আল্লাহ যেমন রূপ ঢেলে দিয়েছে তে মন গুণ দিলে আর কিছুই দরকার নেই।তাই ফজল বলে আমার তো অভাব নেই,আমি হুরি কেতাই নিজে পড়া শিখাবো।ফজল দাঁত দিয়ে বাখারি চাচতে বলে।কমলা জানো?হয়তো গ্রামের আর সবার কাছে শুনেও থাকতে পারো। আমার দাদি ছিল পরীর মত সুন্দর।মনে হয় মনে হয় হুরি আমার দাদি রূপ পেয়েছে।কমলা হেসে বলে।এই যে বলো না, তোমার হরিকে আমি কোথা থেকে আনলাম।দুই জনই হেসে ওঠে।অতি সুখে হাসে ওরা।ওদের নিজেদের হাল।লাঙ্গল আছে দুই কানি জমিও আছে।বতরে সময় দুই একজনকে কামলা ও খাটায় ফজল।আর কমলার সাথে সবসময়েই একজন থাকে। যে বা না শুকানো ওড়ানোতেও সাহায্য করে।গায়ে গরুটার মুখে।যাব না দিতে দিতে কমলা বলে।এ বারে গাই বিয়ালে দুধ কিন্তু একটুও বেচতে দেব না।মেয়েরআমার সুন্দর শরীর।তাকে সুন্দর রাখতে হবে না।তাছাড়া তোমারও কাম কাজের শরীর তোমার দরকার।হুরি খেতেই আইলে।পুকুরের পাড়ে দৌড়ে বেড়ায়।দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় সবার।সবাই বলে। আল্লাহই জানে মেয়েটারকপালে কী আছে।তাই যে যাঁর জানা মত বলতে থাকে।সুন্দরীদের কপালে নাকি সুখ সয় না।সুন্দরীরা ভালো বর ভালো ঘর পায় না ইত্যাদি।অবশ্য সবই ক মেলার আড়ালে বলে।তাই হুরি যত বড় হয় ক মেলা তত মুখ সুখায় বুক সুখায়। প্রতিবেশীদের সম্ভাব্য কথা কমলাও ভাবে।কিন্তু ফজল সে কথা হেসে উড়িয়ে দেয়।বলে আমার হুড়ি এমন বাড়িতে যাবে যেখানে সুখের বান ডাকবে তুমি দেখে নিও। আর সংখ্যা কাটতে চায় না।আবার ফজলের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে।পাড়ার মেয়েদের সাথে স্কুলে যায় হরি। ক্লাস সিক্স পার হতে না হতেই বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করে।নিজের গ্রাম থেকে আবার আশেপাশের গ্রাম থেকেও।তা ফজল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে।সে যখন বিয়ে তো দেবই তবে আর একটু পর লেখা শিখেনিক।মেয়েরআমার মাথাও ভাল।ফজল আসলে তাড়াহুড়া করে মেয়ের বিয়ে দেবেন না।তো বাজার যাচাই করে দেবে।মেয়ে যখন তাঁর সুন্দর, আবার লেখাপড়া আদম শিখছেনতখন আর তেমন ভাবনার কী আছে।আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ফজল মেয়ের বিয়ে দেবেন না।সেটা কমেলার ও। মনের কথা।এমনকী এই গ্রামেও দেবে না।একটু দূরে দেবে।যাতে কুষ্ঠ মিতা হয় বেশ যোগাড়যন্ত্র করে যাওয়া যায়।বেড়াতে যাওয়ার আমেজ থাকে।আগে পিসের দুই দিন ধরে।আর মেয়ের শ্বশুরবাড়ি নিত্যদিনের কথা তাঁদের কাছে আসুক এও চায় না ফজল।মেয়েকে সে মেয়েরমনের মত করে সংসার করাসুযোগ দেবে।তবে পালাপার্বণে না আসতে দিলে কী করে যে মন বাঁধবে সেটাই বুঝে উঠতে পারে না।তবে ফজল বিশ্বাস করে।আর তাই কমলাও সত্যি বলেই ধরে নেয়।তারা হুরির শ্বশুরবাড়ির সাথে খুবই ভাল সম্পর্ক রাখবে।আর তাহলেই মেয়ে সুখী থাকবে।মেয়ের সুখের জন্য তারা সব  সব করবে।হুঁরির চলাফেরা দেখে ফজলের ভাল লাগে,চেয়ারম্যান বাড়ির মেয়ের সাথে হুরীর সম্পর্ক।গলায় গলায় বন্ধুত্ব।তাই সিয়ার ম্যানের মেয়ে লাকি প্রায় ফজলের বাড়িতে আসে হুরি সাথে।কমলা শিখায় তুলে রাখা গ্লাসে করে সরবত করে দেয়।গাছ থেকে কাগ্জি লেবুতুলে আনে।তাই ওরা ঘরেজলচৌকিতে বসে কথা বলে হাসে গান গায়।কমলার মন ভরে যায়।মনে মনে ভাবে হুরীর আসলে চেয়ারম্যানদের মত বড়লোকের ঘরেই জন্মানো উচিত ছিল।কমলা তাড়াতাড়ি একটু আলো চালের ক্ষীর রাতে বসে।বলে এ বেলাটা থেকে যাও মা।এক মুড ঘি ভাত রাঁধি খেয়ে যাও।হুরি যেন লাকির কাছে ছোট না হয়ে যায় সে দিকে সব সময়ই খেয়াল রাখে কমলা। দশ মাসে দুই জন সই পাতিয়েছে। এটা বিয়ের মতোই আনন্দ করছে ওঁরা।স্কুলের সমবয়সী সবাইকে নিয়ে বনভোজন করে খেয়েছে।তার পরে ওকে উপহার দিয়ে তথ্য পাঠিয়ে তবে সই পাতানো।লাকি শোয়ের জন্য একজোড়া কানের দুল গড়িয়ে দিয়েছে।দেখে ফজল ও হাটের সেরা শাড়িটা গ নেই।হুরিকেএনে দিয়েছে।সঙ্গীকে উপহার দেওয়ার জন্য।ফজল হাড় থেকে চিনিটা গুঁড়া সব সময় বাড়িতে এনে রাখি।আরমানের বাড়ির মেয়ে তাঁর বাড়িতে আসে এ কি কম কথা?তা ফজলের রেডিও আছে অনেকদিন থেকে।এবার সে ঠিক করেছে, টেলিভিশন কিনবে।মেয়ে অন্যের বাড়িতে টেলিভিশন দেখতে যাবে।তাই এটা ঠিক না।আর মেয়ে তো বড় হয়ে উঠেছে।বিয়েঠিকঠাক হওয়ার আগে সে তার বাড়ির মেঝেটা ও পাকা করে ফেলতে চায়।তখন কত গণ্যমান্য লোকজন আসবে?কাঁচা মেঝে।কাদা কাদা হয়ে যেতে পারে।মেয়েকে নিয়েই তার যত সুখ চিন্তা যত আল্লাদ লাকীর বিয়ে হয় পরমানন্দ পুরে।আর কী আশ্চর্য হুলিও সেই গ্রাম থেকেই সম্বন্ধ আসে।ব্যাপারটা কাকতালীয় হলেও ফজল ভাবে এ বুঝি দুই শোয়ের এই একাত্মতার কারণেই হয়েছে।তাঁর ভাবে দুইশ এর গ্রামে থাকলে উভয়ই ভালো থাকবে।এক সাথেই নাই ওর আসতে পারবে যেতে পারবে।একে অন্যের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হবে।গল্পগুজব করবে।তাঁর শ্বশুরবাড়িতে থেকেও বাপের বাড়ির আনন্দ পাবে দুই সইয়ের গ্রামে থাকলে। তা ছাড়া শেয়ার ম্যানগ্রামে তাঁর মেয়ে বিয়ে দিয়েছে সেই গ্রামে ফজল মেয়ে বিয়ে দিতে আর আপত্তি কী?এই শা ত পাঁচ  এই ভেবে ফজল হুরীর জন্য পরমানন্দ।দুপুরের প্রস্তাবিত ছেলেরসাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলে।ছেলেটিও দেখতে সুন্দর।শুধু রংটা শ্যামলা।তবে এই শ্যামলা হওয়া আর আফজালের ভিতর এই কটা আলাদা হোলস যেন উঠেছে।ফজল ভাবে।তাঁর মেয়ে রঙ যে আবজালের রঙের ব্যাপারটা পুষিয়ে যাবে।চমৎকার টিনের বাড়ি আর চাকচিক্য রয়েছে আফজাল দের।ফজল তা দেখে মুগ্ধ হয়।বাড়িতে এসে কমলাকে বলে।কমলা ফজলের অতি উৎসাহ দেখে একটু ফুরোমন কাটে।নতুন টিনের বাড়ি এত চাকচিক্য ওরা কয় পুরুষের খানদানি তা দেখেছে তা।নাকি উঠতি?ফজল ক মেলার কথাকে পাত্তা দেয় না।শুধু মনে হয়, ওরা দুইশ এই গ্রামে থাকবে।আনন্দে থাকবে।ছেলের হাতে নগদ পয়সা তাতে সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্য ডেকে আনতে কতক্ষণ।হুড়িয়ে একেবারে উড়ন্ত পরীর সাথে শ্বশুরবাড়ি যায়।কিছু কম রাখেনি ফজল,দিয়েছে থুয়েছে একেবারে খোলা হাতে খোলা মনে।তাই জামাইয়ের নতুন ছাঁটের চুল কাটা।শার্ট প্যান্টের ফাইল।দেখে মনে মনে বলে।ব্যাটা আমারশৌখিন বটে।ফল বুঝতে পারে আফজাল সিগারেট খায়।আর বেশ দামি খায়।তাতেও হাসে বলে।জামাইয়ের আমার উচ্চায় দৃষ্টি তাই তো সে হুরিকে পেল।সব কিছু যখন সুন্দর আর ভালো পছন্দ।তাই বুঝিব টাও পেল সেরা।একে বারে দশগ্রামের একজন।আদর আপ্যায়ন আসা যাওয়া নিয়ে বেশ চমৎকার কাটছিল।আর এর মধ্যেই এলো ভোরের আলোড়ন।সারা দেশের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে যেন উৎসবের ঢেউ বয়ে গেল।নতুন দোকানপাট চা বিস্কুট, সিগারেট সাজানো।নানা নকশার নানান দলের পোস্টার গ্রামগুলো যেন নতুন রূপে সেজে উঠল।সন্ধ্যার পর আলো ঝলমলে গ্রামগঞ্জ একেবারে প্রাণময় হয়েগেল।সবার মধ্যে ওই সুপ্ত উত্তেজনা আর আনন্দের হিল্লোল।যার যার প্রার্থিত জন ও দলের জন্য সামনে বা গোপনে আলোচনা করা।তাঁদের জন্য কলা আর অবসর সময়ে সেইসব নিয়েই আলোচনা সভার মধ্যেই ব্যস্ততা।কিন্তু আফজাল যেন একটু অতি ব্যস্ত হয়ে উঠে। সারাক্ষণই লোকসমাগম হচ্ছে বাড়িতে।বাইরে এ কটা কয়লার চোরা বসে সেখানে সারাক্ষণই চায়ের পানি ফুটছে।ভিতরবাড়িতে হুলিও তেমন ব্যস্ত।বিস্কুট আর মিষ্টি পানি পান সাজাতে সাজাতে।অনেক রাত হলে তবে আফজাল বাড়ির ভিতরে আসে।যখন বাইরের বসার ঘর থেকে একে একে সব লোক আড্ডা মজলিশ ভেঙে যায় যার বাড়িতে যায়।তা।ভিতর বাড়িতে আসার পরেও আফজালের আরো অনেক ক্ষণ কাজ থাকে।কয়েকটা ছোট ছোট ছেলে ছোকরা রেখেছে।তারা।আটা জাল দিয়ে আঠা তৈরি করে তারপর পোস্টার নিয়ে যায়।আবজাল সেগুলো তো দার কী করে?ওদেরকে পোস্টার বা করে দেয়। তারপর ঘরে আসে।তাই সিগারেট ধরিয়ে স্বপ্নে বিভোর থাকে আফজাল।রুজি রাতে টাকার নোট গুনে অনেক অনেক টাকা।হুঁড়ি কোনওদিন এত কাছা টাকা দেখে নাই।অবাক হয়ে গেল বলে।এত টাকা কীসের ব্যবসা তো মার?কেন ভোটের ব্যবসা?তাই এ বারে টিনের ঘর ছেড়ে ইটের দালান তুলব।হুরিআমার পরী তোমার খুবই পয়া।বিয়ের পরপরই ভোটের মৌসুমটা এলো।দল তাঁকে জিতিয়ে দিতে পারলে শুধু বাড়ি না গাড়িও হবে।আমার হরিকে নিয়ে আমি তখন ঢাকার শহরে গাড়ি করে ঘুরে বেড়াব।হুরিবলে সে কী ভোট আবার ব্যবসা নাকি? তাই আফজাল বলে।ব্যবসা, গো ব্যবসা।সে তুমি বুঝবে না।তা যেমন করেই হোক দলকে আমার জেতা বই তখন বুঝবে সে কেমন ব্যবসা।ভোটের দুদিন আগে তুমি তোমার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিয়ে আসবে আমাদের বাড়িতে।এখানেই খাবে। দাবে থাকবে।আর আমি যেটাতে বলব সেটা তে ভোট দেবে।ব্যস তোমার কাজ এতটুকুই।কী পারবে না?ভবিষ্যতে সুখের জন্য এ আর এমন কি তাই না।হুরি কোনও কথা বলে না।ভিতরটা কেমন যেন শিরশির করে ওঠে।এ ধরনের অস্বস্তি কাজ করে।তাই আফজাল ভোটের দিন সাতেক আগেহুরীকে তাঁর বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।যাবার সময় বলে দেয় ঠিক ঠিক মনে রেখো সব।তোমার দিকের সব আত্মীয় যেন আসে।তাঁদের থাকবার ব্যবস্থা আমি করে রাখব।ভোটার লিস্ট ও থাকবে ঠিকঠাক। মনে রাখবে ওরা সব কিন্তু এই পরমানন্দপুর ভুটান।হুরী বাড়িতে আসা দেখে খুশিতে ভরে ওঠে ফজলের মন।কমলা তাড়াতাড়ি কচুর শাক খেয়ে চিংড়ি দিয়ে রাতে বসে হুগলির সবচেয়ে পছন্দ বলে।তাই ফজল বলে।দেখেছ জামাইয়ের কেমন বড় মন।ভুটের হরিকে পাঠিয়ে দিয়েছে।হুরী যে এই গ্রামের ভোটার তা তো জামাই জানে।তাই এ কটা ভোটেরও যে দাম আছে সে কারণেই না বলতেই হুরি কেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।একেই বলে দেশের আসল মানুষ।সত্যিই জামাই আমাদের গর্ব করার মত।কিন্তু হরিরমুখে কোনও হাসি দেখে না ফজল।এভাবে স্বামী ছেড়ে এসে তাই মন ভার।নিজেদের অতীতের কথা ভেবে মনে মনে হাসে আর কমলা কে বলে।কমেলা বলে সেও ব্যাপারটা লক্ষ্যকরেছে।তা হুরি দেখে তাঁর নিজের গ্রাম ও ভোটের আনন্দে উল্লাসেজমজমাট অবস্থা।এই লাকির আব্বাসে এ গ্রামের চেয়ারম্যান।সে সে এ বারও। আর এত নিশ্চিত যে সেই পারবে।গ্রামের লোকখুবই ভালোবাসে।শোয়ের বাবাও গ্রামকে আর গ্রামবাসীকে নিঃস্বার্থভাবে ভালো।এই আনন্দের সময় লাকীও এসেছে।হুরি ওদের বাড়িতে যায়।দেখে উঠানে এর কোণায় মাছ কাটা হচ্ছে বড় বড় হাঁড়িতে। ভাত ডাল রান্না হয়।অনবরত লোক খাচ্ছে বলে দলে দলে।লোক থই থই করছে।তাজের যেমন অন্ত নেই, তেমনই আনন্দও অন্ত নেই।এখানে এসে মনটা খুশি হয়ে ওঠে হুরীর।জোর লাগে সাথে বড় বড় যোগে লেবু চিপে চিপে আখের গুড়ের সরবত করে।অনেকদিন পর গ্রাম খুলে কথা বলে হাসে।বাড়ি ফিরবার সময় মনটা আবার তার ভার হয়ে যায়।কী করে সে একথা তাঁর বাবাকে বলবে।সে যে কথা আফজাল বলে দিয়েছে।কী করে সে তার সময়ের এত বড় ক্ষতি করবে।কী করে সে তার নিজের গ্রাম এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।কী করে সে নিজের সাথে প্রতারনা করবে।সে ভোটের কিছু না বুঝলেও এতটুকুও বুঝে যে শোয়ের আব্বা একজন অতি স্বজন মানুষ।তাঁর ভোটে নেতা মানে গ্রামের ভালো হওয়া।বাবা ফজল ও লাকির বাবার দলেরই।গ্রামে খুব কম লোকই আছে যে চাচাজান এর নিমক খায়নি।সে বুঝতে পারে না কি করে সে এই চাচাজান এর বিরুদ্ধে এত বড় নিমকহারামি করবে। যে চাচা তাঁকে তাঁর মেয়ের লাকির মতোইভালোবাসে।অনেক গরিব ঘরের হলেও কোনও দিনই সে দৃষ্টিতে দেখেননি ওঁরা।বরং সই পাতানোর পরচা সবসময় জোড়া কাপড় কিন্তু।একটা লাকীর জন্য এ কোটা হরির জন্য।তাই হরির চোখফেটে কান্না আসতে চায়।দিনরাত ছটফট করে হুরি।ভাল করেনাওয়া, খাওয়া ঘুম কিছুই হয় না।ভোটের আর মাত্র দুই দিন বাকি।আগের রাতে শাতটা  আট টা গোরুর গাড়ি এসে দাঁড়ায় হরি দের বাড়ির সামনে।হরির বুকের ভিতরটা থর্থর করে।রাগে দুঃখে আর অসহ্য যন্ত্রণায়।ফজলকী ব্যাপার রে হরি। এতো গাড়ি কেন?বাবাকে সে কিছুই বলে না।বলতে পারেনা।সত্যি কথাটা হুরীর কাছে এতই কদর্য জেতা সে প্রকাশ করে না।প্রকাশ করতে পারে না। মন চায় না।এই কয়রা ভেবে ভেবে সে মন স্থির করে ফেলেছে।সে তার সংকল্পে ধীর হও।পারবে না সে কিছুতেইসময়ের সাথে নিজের সাথে।গ্রামের সাথে কোনো কিছুর সাথে সে প্রতারণা করতে পারবে না।হুরী বাবাকে বলে।গাড়িগুলো আমার শ্বশুরবাড়ির।ওরা পাশের গ্রামে মালপত্র আনার জন্য যাচ্ছেতাই পথে আমার খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে।আমি কেমন আছি।তোমাদের জামাই খোঁজ নিয়ে যেতে বলেছে ওদের।হুরি গাড়োয়ানদের পেট পুরে খাওয়া যায় তার পর ওদের যেতে বলে দেয়। ফাঁকা শূন্য গাড়ি দেখে আফজাল গুরু তো রেগে আগুন।ভোটের দিনের সকাল।এতটুকু সময় নেই তাঁর হাতে।তবু তার মধ্যে এ কটা গুন্ডা নিয়ে এসে হাজির হয় শ্বশুর বাড়িতে।তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসে হুরী।বসতে চেয়ার।এগিয়ে দেয়।কমলা শরবত করতে ছুটে যায়,হুজিকে বলে বাতাস করতে।আজকাল খুবই রেগে গিয়ে কঠিন গলায় বলে।আমি বাতাস খেতে আসিনি,শরবত খেতে ও আসেনি।আমি বসতেও না।শুধু জানতে এসেছি কেন কেন সাহসে সে আমার গাড়িগুলো ফেরত দিয়েছে।কেন সে আমার কথা মতো কাজ করেনি।ভর্তি যাওয়ার কথা ছিল।শূন্য না।থতমতখায় কমলা।সে ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারে না।তাই হুরীরদিকে তাকায়।হুরি এবারে শান্ত ও স্থির গলায় বলে।আমি যা করছি বুঝেসুঝেই করেছি।এ গ্রামের ভোটারদের আমি বেনাম ও গ্রামে ভোট দিতে যেতে দিতে পারব না।আমি তা পারব না বলেই খালি গাড়ি পাঠিয়েছি।আফজাল এখনও বিকেল পর্যন্ত সময় আছে। পারবে কি না বলো।হরি পারলে আমি আগেও করতাম।আমার নতুন করে ভাবার কিছু নেই। আফজাল আরো রেগে আরো উচ্চস্বরে।আমার এখানে এত সময় নষ্ট করার সময় নেই।খুব খারাপ হবে কিন্তু তুমিই ভেবে বলো হরি।হুরি আমি একদিন তো শুধু এটা নিয়েই ভেবেছি।আর ভেবেই ওই কাজ করেছি।আফজাল ঠিক আছে।মনে রেখো শূন্য গাড়ি পাঠিয়েছে যখন।এখন ওই বাড়ি থেকে কোনও গাড়ি তোমাকে আর কোনওদিন নিতে আসবে না।আমি বললাম,এটা আমার ইজ্জতের ব্যাপার ছিল।তুমি তোমার বাবার বাড়িতেই থাকো,আমি প্রয়োজনীয় কাগজ পাঠিয়ে সেই ব্যবস্থাই পাকা করে দেবো।তাঁর কথা শুনে কমলার হাত থেকে ঠাস করে সরবতের গ্লাস পড়ে গেল।হরি স্থির দাঁড়িয়ে থাকে যেন পাহাড় পাথরের মূর্তি।আফজাল হোল্ডার স্টার্ট নেয়।জামাই এসেছে শুনতে পেয়ে শেরম্যান বাড়ি থেকে ফজল ছুটে আসে।দেখে আবজাল চলে যাচ্ছে।হাত তুলে দূরে ডেকে আফজালকে থামাতে যায় ফজল।হাতে তাঁরইলিশ মাছ।শুনেই কিনে ফিরছি।ইলিশকেটে ভাজতে আর ক মিনিট।ফজলে তোলা হাত থামিয়ে দেয় হুরি। শান্ত গলায় বলে ওকে যেতে দাও বাবা।
Read Also :-
Labels : #Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#ইলেকশনের ঢেউ ,
Getting Info...

Post a Comment