ডাঙ্গাতেই ডুবছি

গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে গোলাপ হাতে একটাকার বুট ভাজা, সমান দূরত্ব রেখে আর সমানভাবেই সময়ের ব্যবধান রেখে একটা একটা করে মুখে ঢিল ছোড়ার মত ছুড়ছে। কি ভাবছে গোলাপ, অনেক কিছু আবর কিছুই না। কিছুই না এজন্য যে ওর ভাবার কিইবা মূল্য আছে। ওই বুট ভাজাগুলো বুট না হয়ে যদি ফতোয়াবাজের ঢিল হয় একেকটা, আর বুক ফেটে পিঠ ফেটে যদি রক্ত ঝরে কিংবা সে বেহুস হয়ে পড়ে তাতেই বা কার কি ? কেউ যদি হঠাৎ মাথায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনে, সেটা তার বদান্যতা নয় বরং বাকি টিল কটা সজ্ঞানে হজম করানো হবে বলে জ্ঞান ফিরানো। গোলাপ হেরে যেতে চায়নি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে হেরে গেল। কত ছলচাতুরি করেই না তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে। পুলিশের হতে ধরা পড়ায় হাত থেকে, ভন্ড উদ্ধারকারীদের হাত থেকে। কখনও হাতে বাজারের থলি নিয়ে, ভাব দেখাতে হচ্ছে যেন কোন বাড়ীর কাজের বুয়া, কখনও টিফিন বাটি হাতে ভাব দেখতে হচ্ছে যেন হাসপাতালে বা কোন অফিসে খাবার নিয়ে যাওয়া। এই যে গাছতলায় বসে আছে, গোড়াটা স্যাঁতসেতে কাদায় ভরা পিছল, হয়ত বা জোঁক ধরবে পায়, কোন পুরানো কোটর থেকে সাপও বেরিয়ে আসতে পারে, তবুও মানুষরূপী সাপদের চেয়ে এগুলোকে তার কম ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়। একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছে, হেলান দিয়ে একটু চোখ বুজে নেবে নাকি, লম্বা হাই তোলে গোলাপ আর ঠিকমতো তাকাতেই ঘুম তো দুরের কথা লাফ দিয়ে উঠে দাড়িয়ে চলতে শুরু করে। পিছন থেকে শুনতে পায়, 'এই যে শুনুন, শুনুন না ! একটু দাঁড়ান, কথা আছে আপনার সাথে । গোলাপ না শোনার ভান করে, দেখেনি এমন ভাব দেখিয়ে আরেকটু দ্রুত পা চালায়, মনে হচ্ছে পিছনে ধেয়ে আসা লোকিটি একেবারে নাছোড়বান্দা ধরনের। শুনুন শুনুন করে বলেই চলেছে। কোন খবরের কাগজের লোক নাকি ? নাকি সমাজ সেবক, কিংবা নিছক সৌখিন ফটোগ্রাফারও হতে পারে। এমন কত জনের সাথেই না ফেম করতে হয় তাদের। কিন্তু এখন তো সে ওই রেড লাইট এলাকার মেয়ে না, টানবাজার বলে কোন বাজারই আর নেই কান্দুপট্রি নেই। যে স্থানের আর কোন অস্তিত্বই নেই সে স্থানে কোন মেয়ে সে হয় কি করে ? আর এই ভাবনা মনে দৃঢ় হতেই থেকে পিছন ফিরে তাকায় গোলাপ। আমাকে ডাকছেন ? আমি বুঝতেই পারিনি, আমাকে আবার এক্ষুনি সোমাকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে, এমনিই দেরী করে ফেলেছি, ডান কব্জিতে বাধা বেশবড় জেন্টস সাইজের ঘড়িটার দিকে তাকায় । সোমা আপনার মেয়ে বুঝি ? কোন স্কুলে পড়ে, কয়টায় ছুটি হবে ? একি কথা, সোমা আমার মেয়ে হবে কেন ? সোমাদের বাসায় আমি কাজ করি। আমাদের আবার ছেলেপুলে থাকে নাকি। কথাটা বলেই গোলাপ কেমন যেন ভ্যাবাচাকা বোধ করে, আসলে সে একসাথে তিন তিনটা প্রশ্নের জন্য তৈরী ছিল না, আর মনের কথা কতো সময় অজান্তেই বের হয়ে আসে, কখনও দুখে, কখনও রাগে, কখনও ক্ষোভে । আর ওই ধুরন্ধর লোক সেই সুযোগটাই নিয়ে ফেলে, আর আপনি থেকে তুমিতে সম্বোধন করে বেশ আদুরে গলাতে বলে, কেন গো, তোমাদের ছেলেপুলে থাকতে নেই কেন? তুমি বুঝি বিয়ে করনি? গোলাপ বুঝতে পারে যে সে ধরাপড়ে গেছে ফোস তুলে বলে, অতো কথায় দরকার কি বাপু, কি বলতে চান বলেন। এই ভর দুপুরে কোথাও যেতে পারব না, আমার মন ভালো নেই। শরীরটাও যেন চলছে না আর। একটু বসবে, বস না, দুটে কথা বলি, কোথাও তোয় নিয়ে যাচ্ছি না, সে অভ্যেস আমার নেই। আর ঘাড়ে ক্যামেরা দেখে ভয় পাচ্ছ, না বললে তোমার ছবি আমি ভুলব না, পত্রিকা কাটভির জন্য কোন নিউজও করব না, আসলে আমি তোমার সাথে শুধুই কথা কলতে চাচ্ছি। সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় গোলাপ, চোখে মুখে সত্যিই একটা স্নিগ্ধ সরলতা আছে। এতোদিনের অভিজ্ঞতা থেকে লোক চিনতে খুব একটা ভুল হয় না, মনে হচ্ছে বিশ্বাস করা যায। তবু ঝাঁঝালো গলাতেই বলে, নাম কি আপনার ? আশ্চর্য মেয়ে তো তুমি, নিজের নাম না বলে প্রথমে আমার নাম জানতে চাচ্ছ ? ঠিক আছে বলব কিন্তু তোমারটা বলবে তো ? আরে ধ্যুৎ, আমাদের নাম আবার নাম নাকি, যার যে নামে ডাকতে ইচ্ছে করে ডাকে, কেউ আবার আদর করে আপনি আত্তি করে কেউ তুই তুকারি করে, আমরা সব মেনে নেই। সবার সব নেশার অরা আদর আবীর হয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যতো সব গালভরা নাম। কিন্তু আপনাদের তো একেবারে সত্যায়িত করা সত্য নাম। এতোটুকু অদল বদল নাই। একেবারে চেহারা মিলিয়ে নামের মত নাম । সে কি তুমি দেখি সত্যায়িত ব্যাপারেটাও জান, সিহাব খুবই কাঠখোট্টা নাম আপনার, অবশ্য মানে টানে জানি না, মানেটা হয়ত একেবারে নহম হতে পারে, একেবারে আপনার মত যদিন আমাকে তোমার সরল আর নরম বলেই হয় তবে একটু চলোনা বসি কোথাও । কোন রেস্তরায় না ? না তা যাব না, তেমন পোশাক পরিনি নানা রেস্তরায় না, ওই গাছতলাতেই, শুধু কিছু খাবার নিয়ে আসব দশ মিনিটের মধ্যে, ইচ্ছে করলে আমরা একসাথেও যেতে আসতে পারি । আমার সাথে যেতে আপনার আপত্তি না থাকলে আমার আবার অসুবিধা কি ? আপনার প্রেস্টিজ পাংচার না হলে আমার তো বরং লাভ, অনেকেই শয্যা সঙ্গী করে, কিন্তু চলার সাথী জীবন সাথী কোনটাই করে না। তুমি এতো সুন্দর কথা বল, এতো কিছু জান, নিশ্চয়ই বেশলেখাপড়া করেছ, তা কতদুর পড়েছ কোথায় পড়েছ। এতো ভনিতা কেন, বুঝতে পারচ্ছি, আপনি আমার নাম ধাম জীবন ইতিহাস জানতে চাচ্ছেন তাই না ? বলেছি তো, আপনাকে আমি বিশ্বাস করেছি সিহাব সাহেব। সব বলব। এমন কাউকে বলতে চাই যে সত্যি সত্যিই শুনবে, শোন কথাকে বেচে খাবে না, শুধু একজন দরদী সমঝদার চাই। মরমীয়া চাই গো, বুঝেছেন মরমীয়া চাই। ছোটতে শোনা একটা গাঁনের কথা মনে পরে গেল— মরমীয়া তুমি চলে গেলে দরদী আমার কোথা পাব— কারে আমি এ ব্যাথা জানাবো, মনে হচ্ছে তুমি গানও জান, আর ফালতু চটুল কোন গান নয় একেবারে বানী ও সুর সমৃদ্ধ গান। তা গান শিখেছিলাম বৈ কি। সবকিছুই তো সুরে তালে ই চলছিল। দাদু গালটিপে দিয়ে বলতো নাচুনী বুড়ি, মা চুলের গোছা ধরে বিনুনি বাঁধতে গিয়ে বলতেন, কুন্তলা মেয়ে আমার, বাবা কি যেন কেন আমাদের কোন নাম ধরেই ডাকতেন না, বলতেন বড়, মেজ, সেজ, ছোট। আমরা চার বোন — তাই রক্ষা জানিনা এরপর বোন হলে বাবা কি বলে ডাকতেন। বাবার স্বভাব ছিলো ভীষণ রকম চাপা, আমাদের ভাই না থাকার কোন কষ্ট তার মধ্যে ছিল কিনা, বেশী মেয়ে থাকার চিন্তা ছিল কিনা কিছুই বোঝা যেতো না। দিব্যি লেখাপড়া শিখছিলাম, স্কুলে নানা গান করছিলাম, শাকে আর চুনামাছে পোনামাছে হাসি খুশি দিন কাটছিল । আমাদের কারও কোন অভিযোগ, নতুন কোন চাহিদা ছিল না কারও কাছে। বাবা নিজের ঘড় নিজে ধুতেন, নিজের বিছানা মশারি খোলা সব — সেই সাথে আমরাও সব স্বাবলম্বী । কিন্তু কেমন করেই যে এমন সব হয়ে গেল! সিহাব সাহেব, আগে আসুন খেয়ে নেই তারপর কথা, রুটি তরকারীই যথেষ্ট ছিল আবার মাংস নিয়েছেন কেন বলুন তো ? মাংস আমি পারতপক্ষে খাই না, আমার রুচিতে বাধে, কারণ আমি কাঁচা মাংশের বিকিকিনি করি কিনা তাই । অমন কথা বোলনা তো ? নামটাতো এখনও বললে না যে নাম ধরে ধমক দিব। বলব, বলব, কি বা এমন নাম, তবে আমার নামটা এই লাইনে আসার পর আর বদলাতে হয়নি, চমৎকার মানানসই যেমন ধরুন রহিমা, করিমা হলে অবশ্যই বদলাতে হতো, সিনেমার নায়িকাদের মতো, আমাদের নামেও চমক লাগে কিনা । আমার গোলাপী গাল, গোলাপী ঠোট, গোলাপী রং তাই ফুলের রানী গোলাপ নামটা সবার ভালোলেগে গেল। ছোট বেলায় পাড়ার বখাটেরা বলত স্কুলে আসতে যেতে পথে, গোলাপ তোর এতো সৌরভ, একদিন কাঁটাগুলো তুলে তোর বাহুতে জড়াবো। হায় তখন একবারও যদি জানতাম ওটাই হবে আমার পেশা। তোমার নামটা সত্যিই যথোপযুক্ত। গাইতে ইচ্ছে করছে সেই গানটা— 'সোনার হাতে সোনার কাঁকণ কে কার অলংকার।' আমার কি মনে পড়ছে জানেন ? আপনা মাংশে হবিনা বৈরী।' এই রূপ আমার কাল বলুন আর দুর্ভাগা বলুন যাই হোক হলো। গ্রামটা ছিল নদীর ধারে, ধরুন শ্যামল গাঁ। প্রতি বছরই নদী একটু করে ভাঙ্গছিল, বাবার মাথাও গরম হচ্ছিল, মেজাজ খিটখিটে, চাপা স্বভাবের ক্রোধ রাগ শুধু জমছিল, একদিন যেদিন বৈঠক ঘরটা নদী রাতারাতি নিয়ে নিল, বাবার চোখে আগুন জ্বলছিল। সেই বর্ষাতেই দাদা চলে গেল মর্তভূমি ছেড়ে, মর্তভূমি ছাড়ার পর তার মর্তে ঠাই হলো না, লাশ ভাসানো হলো কলার ভেলায় বেঁধে, বোতলে লেখা হলো, যদি কেউ ডাঙ্গা পান তাহলে অনুগ্রহ করে কবরস্থ করবেন এই লাশকে । জানিনা দানা আমার ডাঙ্গা পেয়েছিল কিনা, কিন্তু আমি যে তারপর থেকে ডাঙ্গাতেই ডুবছি। বাড়ী ভাঙ্গলো দাদী নেই, বাবা আমার, কম কথা বলা বাবা আমার অতিরিক্ত ও অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করলেন বুঝলো সবাই বাবা আমাদের পাগল হয়ে গেছে। বাড়ি ভাসছে পানিতে, সারাগ্রাম গিয়ে সড়কে উঠলো, সাথে ঘটি বাটি গরু ছাগল, বেপর্দা বেসাহারা আমরা চার বোন। মা আমার এতো সুন্দর যে এখনও মৌমাছি ভন ভন করে, তার উপর আমরা সবাই একেবারে উঠতি বয়সের। ক্লাস নাইন, এইট, আর দুজন একসাথে সেভেনে। চকি উল্টিয়ে চাদর বেঁধে রাখায় কি কোন আড়াল করা যায়, ওইযে রাস্তায় এলাম তারপর থেকে এই তো রাস্তায়, ঘরে আর ফেরা হলো না । আমাদের দুর্দশা দেখে, নাকি দুর্ভাগ্যকে মেনে নিতে না পেরে আমাদের পাগল বাবা হারিয়ে গেল। একদিন সকাল থেকে কোথাও আর তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না, রাতের অন্ধকারে কোথায় যে সে চলে গেছে। মায়ের দুচোখের পানি বন্যার পানিকে বাড়িয়ে তুললো, আমাদের পুঁজি ফুরাতে থাকলো। টিমটিমে আলো জ্বেলে মা সারারাত জেগে আমাদের পাহারা দেয়। আশে পাশের লোকেরা মাকে শোনাল পাগল লোকটাকে বেঁধে রাখতে পারেনি, নাকি ইচ্ছে করেই রাখেনি কে জানে ? এখন মেয়েদের আগলাছ, ঢং যত সব ! মায়ের কান্না বাড়ে, অসহায় মা শুধু মাথা খোড়ে ভাগ্যের কাছে। প্রায় মাস খানেক পর পানি নেমেছিল কিন্তু আমাদের ভিটায় ছিল শুধু দাদার হাতের লাগানো লাল পেয়ারার গাছটি আর শিমুলটা। আর সেই মাচাটা। যেটা খুব শক্ত খুটি করে বাবা আর দাদা বসে বসে বেঁধেছিল ধানের বিজ বিংবা বছরের জিনিস রাখার জন্য। দুইটা মাস্টষ থাকবার মতো একটা মাচা। আমার সেই মাচা। তোমার মাচা মানে ? সে কথাও বলব গোঁ, বলব। অতো অধের্য্য হচ্ছ কেন, আমার এতোগুলো বছরের ঘটনা আর তুমি এতো তাড়াতাড়িই সব শুনে ফেলবে ? আমাকে একটু সয়ে নিতে দাও! তোমার কোলে একটু মাথা রাখবো নাকি ? তুমি আদরে চুলে বিলি কাটবে, আমার নরম কানের ভেভিটা নিয়ে খেলবে ? না থাক, তোমাকে আর নষ্ট করতে চাইনা। বরং শোন কবে আমি নষ্ট হয়েছিলাম। আমরা কিন্তু রাস্তায় রইলাম, যাদের সামর্থ ছিল তারা শহরে চলে গেল, ডাঙ্গায় গিয়ে উঠল। আমাদের সহানুভূতি জানানোর লোকের অভাব হলো না। মা দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেলেন পানি সরে গেলেও আসলে আমরা আর কিছু ফিরে পাব না। একটা ভাই নাই যে জমিগুলো বের হলে হাল নামাবে, হালের গরুতো আগেই গেছে বন্যার শুরুতেই বিক্রি করে চাল ডাল কিনতে। ঘরে ঘুটি কিংবা চাল তুলবার কেউ নেই আছে শুধু চারটা সোমস্ত সুন্দরী মেয়ে। চারদিক থেকে ইশারা আসছিল, শিস দিচ্ছিল, রাতে উকি ঝুকি মারছিল, দিনে চাল, তেল ধার বলে দিতে আসছিল প্রথম প্রথম, আমাদের যখন অভাব বাড়ছিল তখন আর ইশারা নয় একেবারে সরাসরি প্রস্তাব এলো মার কাছে। আসলে আমরাও আর নিজেদের রক্ষা করতে পারছিলাম না, যখন অনেক অনেক লোভাতুর চোখ আমাদের কাউকে না কাউকে লেহন করছিল, তাদের কামাতুর চাহনী সর্বদাই আমাদের শরীরকে অপবিত্র করছিল। সাহায্য কর্মীরা আমাদের সাহায্য দিতে এসে অছিলায় ছুয়ে নিত, একটু বেশী দিত আর চোখ টিপে ইশারা দিত। একরাতে আমরা চারবোন তার মায়ে মিলে অনেক কাঁদলাম, অনেক কথা হলো, ছোট দুই বোন চুপ করে শুধু শুনছিল, আমি বড় গোলাপ আর মেজ পারুল মার সাথে তর্ক করছিলাম। তারপর মা বুঝেছিল, কিংবা মা'ই আমাদের বুঝিয়েছিল, প্রত্যেকের দেহই তার নিজ নিজ সম্পদ। তাকে অপবিত্র বা নষ্ট কেউই করতে পারে না, প্রয়োজনে আমরাতো শরীরের অঙ্গ প্রতঙ্গ ব্যবহার করেই থাকি। তাই হাত, পা, যেমন ব্যবহার করি তেমনি সমস্ত শরীর ব্যবহারেও কোন অমর্যাদা নেই। এই মনের শক্তি মা বা আমরা কোথা থেকে পেয়েছিলাম জানিনা, সে শক্তি এখনও আমার অটুট আছে। মাকে আমরা চার বোন ওই শিমূল গাছের একটা ঘর তুলে দিয়েছি, মার উঠানের বেগুন গাছ, বারোমাস বেগুন ফলে, পাশে গাঁদা ফুল গাছেও তাই সিজন ছাড়াও ফুল দেয়, আমরা টাকা পাঠাই, মাঝে মাঝে যাই, আমরা সবাই শহরে চাকরী করি। কি চাকরী করি তা অনেকে হয়ত আন্দাজ করে কিন্তু আমাদের ঘাটাতে কেউ সাহস করে না। বাবা একদিন ফিরবে আশায় মা পথ চেয়ে আছে এখনও। হাঁস মুরগীর সাথে কুকুর ছাগলও আছে মার। আমাদের এখন ঠিকানা আছে শ্যামল গায়ের শিমুল বাড়ী লিখলে পিওন মাকে ঠিকঠিক চিঠি পৌছে দেয়। যেদিন ঠিক করলাম, আমরা ব্যাপারীর সাথে ঢাকায় যাব, সেদিন থেকে মনে আর কোন গ্লানি থাকলো না, আমরা তাকে পাঁচ দিন পর আসতে বললাম। ওই সড়ক দ্বীপেই আমাদের সড়ক তৈরী হলো জীবনের। প্রথকে আমি গেলাম তারপর অন্য বোনেরা, অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন বাড়ীয়ালীর কাছে। তবে আমার বাড়ীয়ালী বলতাম না জৈঠীমা বলে ডাকি। খুব খুবই ভালো একেবারে আমার মায়ের মত স্পষ্ট সত্য কথা বলে। যেখানে আমাদের মত মেয়েদের মান সম্ভ্রম যাবে গোপনে চুপিসারে, যা ধরে রাখবার কোন শক্তিই যখন আমাদের নেই তখন মাথা উঁচু করে লাইনে যাওয়াই ভালো । জেঠিমা বলে, এখন আর মেয়েদের তেমন ফুসলে আনতে হয় না, দালালরা মেয়েদের সহজেই পায় বুঝলি ? ইজ্জত ওভাবে যাওয়ার চেয়ে সম্মানীর সাথে দেওয়া ভালো তা অনেকেই বুঝেছে। জেঠিমার নাম ছিল পদ্মরানী। একেবারে সবদিক দিয়ে তিনি উত্তম পদ্মই ছিলেন এখনও বোঝা যায়। তার সময়ের গল্প শুনবেন সিহাব সাহেব ? খুব ভালো লাগবে আপনার । তাদের সময় তারা খুব কদরে থাকতো, তাদের সাজ পোশাক আর গান বাজনায় মুখরিত আর উজ্জ্বল থাকতো সমস্ত এলাকা। ঝলসানো মাংসের মিষ্টি গন্ধ আর বেলী ফুলের সুবাসে বাতাস মৌ মৌ করতো। এরকম বস্তি বস্তি ভাব ছিল না, নিশানো উঠান ঘরে সুন্দর ছবি, মালা দুলতো দেবীর গলায়, সাঝের প্রদীপ আর মঙ্গল দ্বীপ জেলে তবে মেয়েরা মাথায় ফুল গুঁজতো। তাদের জন্যই ছিল রিকসার বাহন। এ নিয়ে একটা ছড়াও প্রচলিত আছে —— রিকসা চড়ে বেশ্যা যায় ফিরে ফিরে সবাই চায় । এই যে অন্যেরা তাকাতো এতে মোটেই লজ্জা লাগতো না বরং অহংকার লাগতো — সবাই দেখছে বলে। তাদের জন্য সিনেমা হলে আলাদা কর্ণার থাকতো, কতো সম্মান বলুন তো । এখন এসব নেই। তখন তারা পায়ে কোন সেন্ডেল পড়ত না এতেও কিছু মনে হতো না তাদের, তখন কয়জন কুলবধুই বা সেন্ডেল পড়ত ? আর এখন জুতো সেন্ন পড়েই বা কি এমন সম্মান বেড়েছে ? যাকগে, নিজের কথা না বলে জেঠির কথা শুরু করেছিল ওই বর্ষার সময় যখন মনস্থির করে ফেলেছি তখন কি করলাম জানেন ? তুমি কি করেছ তা আমি কি করে জানব গোলাপ । আন্দাজ করতে পারবেন ? মনে হয় তাও পারব না। আমলেও পারবেন না, পারার কথাও নয়। আমাদের পড়ারই একটা যুবক, একসাথেই বড় হয়েছে, মেদহীন সুঠাম গড়ন, শ্যামলা দিখল, মাথা ভর্তি সরল চুল, আর কালো কুচকুচে মোটা ভ্রুরু। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, আমাকে অন্য আর সবার মতো তারও নিশ্চয়ই ভালো লাগতো, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসতাম। সেদিন আর ওর মন জানাবার মতো সময় আমার ছিল না। মাকে বলাম, মা আমাদের বাড়ীর ভিটার মাচাটা একটু দেখে আসি, পানি ভয়ে হয়ত সাপ খেপে বাসা বেধে ফেলবে। আর ওই যুবককে বলেছিলাম সন্ধায় সাওঁকে একটু আমাদের মাচাটায় যেও । কিন্তু মূল্যবান মানে টাকা আর একটু গায়না আছে । একা আমার ভয় লাগবে ওগুলো আনতে । অবশ্যই যেও কিন্তু। আমার বিশ্বাস ছিল ও আসবে। আর একজনের প্রয়োজনে বা বিপদে অন্যজন সাহায্য করবে না এমন অবস্থা তখন ছিল না। আমি সূর্য ডোবার আগেই সাঁতরে ওখানে গেলাম। কলসীতে মুখ বেঁধে ফিতা স্লিপ লিপষ্টিক সুখনো শাড়ি সব নিয়ে এসেছিলাম। মনের মত করে সাজলাম, ভিজা কাপড় বদলে মাচার চারপাশে ঘিরে সুকাতে দিলাম, এর মধ্যেই সাতরে আসার পানির ঢেউয়ে দুলে উঠলো মার্চা, আমার মন তার চেয়েও বেশী দুলে উঠলো। মাচার গায়ে ঢেউ এসে এসে লাগলো আমার মনের ঢেউ তার চেয়েও বেশী উথলালো। আমি ওকে উপরে তোলার জন্য যত বাড়িয়ে দিলাম, কাঁটাছিল গায়। যুবকের ভেজা শরীর শাড়ির আঁচলে মুছলাম, মাথায় চুল দিয়ে পা মুছলাম রবিঠাকুরের ওই গানের মত করে ওগো বঁধু দিনের শেসে ............. আঁচল দিয়ে শুকাব জল, মুছাব পা আকুল কেশে । যুবক বিবশ হচ্ছিল ক্রমশই। কই তোমার মূল্যবান জিনিস পত্র কই, নিবে না ? বললাম, সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস তোমাকে দিব বলেই তো ডেকেছি, অবশ্য তার চেয়েও মূল্যবান সম্পদ আমি সারাজীবনের জন্য আহোরন করব। আপনি ঠিক বুঝবেন না সিহাব সাহেব। আমার তখনকার সেই অনুভব। উদোম গায়ে সামান্য একটু বন্ধে সুঠাম আদিম পুরুষ, যাকে আমি ভালোবাসি, তাকে আমি প্রথম দুবাহুতে বেধে ফেললাম মদির চোখে তাকালাম, পিপাসার্ত ঠোট দুটো চাতকের মতো উর্দ্ধমুখি হলো, আমরা হারিয়ে গেলাম একে অন্যের গভীরে। চারিদিক থৈ থৈ পানির উল্লাস, উন্মুক্ত আকাশের অকৃপণ চাঁদের আলো, মৃদুমন্দ বাতাসে শিমুলের দু একটি পাতা টুপ করে মাচায় কিংবা পানিতে পড়া, মাছ কিংবা জলজ প্রাণীর লেজ খেলিয়ে যাবার শব্দ আমাদের মিলনকে মধুর থেকে মধুরতর করে তুলছিল। গ্রহরের পর গ্রহর কেটে যাচ্ছিল, সন্ধ্যাতারা মাঝগগন ছেড়ে গিয়ে সুকতারা হলো, তবু আমার নেশা কাটেনা ঘোর কাটেনা, ওর নাম আমি আপনাকে বলব না, সেদিন আমি সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় শুর কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিলাম। জানতাম এরপর তো আর নিজের পছন্দ অপছন্দ নিজের ভালোলাগা মন্দলাগা বলে কিছু থাকবে না। তাই সেই বেষ্ণব পদাবলীর লাইনের মতো — ' প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর' আমি তেমনি ভাবে সারাটা রাত তাকে যুগল সাপের মতো করে পেচিয়ে ছিলাম । আমার বাবার মতো উধাও হয়ে যাবার মতোই। এাকে একে অন্য বোনেরাও। আজকে আমি যেমন ভাসছি নিশ্চয়ই ওরাও তেমনি ভাসছে। আমার বেটি ভদ্রপাড়ায় একটি ঘর ভাড়া নিয়েছে, আমরা তার প্রিয় দুই চারজন সেখানে থাকি। জানিনা কেনই বা উচ্ছেদ হলাম, আবার কখনও ঠিকানা হবে কিনা তাও জানিনা। বিভিন্ন কাগজে বিভিন্ন লেখা পড়ি। আমাদের কপাল ভেঙ্গে কারও স্বার্থসিদ্ধি কতোখানি ভালো হবে তাও জানিনা। আমরাতো ডাঙ্গাতোই ডুবে মরছি, তবে সব হারিয়েও একটু অন্ততঃ পেয়েছি যে আমি ইচ্ছা করলেই যে কাউকে ছয়মাসে জেল খাটাতে পারি, এমন কি আপনাকেও । ভয় পেলেন নাকি ? প্রথমেই তো বলেছি, আপনাকে আমার ভালো লেগেছে, নইলে এতোসব বলি? আজকে অনেক দিন পর ওর কথা খুব মনে পড়ছে গো, ওই যুবকের কথা। কোথায় আছে সে যুবক ? আমাকে কি কোনদিন খুঁজেছিলো সে ? গোলাপ ভাবে খুঁজলে নিশ্চয়ই সে দেখা পেতো। খুজেনি বরং ভালো, তার প্রেমিক পুরুষ শুধু তার হয়েই থাক ।
Read Also :-
Labels :
#Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#ডাঙ্গাতেই ডুবছি ,
Getting Info...