বর্ষবরণ আমারও

প্রফেসর অনামিকা হক লিলি
বেকের বোতাম খুলনা এর সেদিন চৈত্রের শেষ দিন ছিল । গোধুলী আলোয় নাকি কালো মেয়েকেও মায়াময় মনে হয় । আমি তখন মাধ্যমিক দিয়েছি, ফলাফল বের হলেই বড় শহরে পড়তে যাব, ভাগ্য প্রসন্ন হলে ঢাকায় । ছাত্রীতো তেমন ভালোথারাপ কোনটাই না, তাই আশা করতে দোষ কি ? আমার সাহস আমার মুখরা স্বভাব অনেকের কাছে প্রশংসণীয় হলেও তোমাদের পছন্দ হতো না সে আমি বুঝতাম । দাদা সেদিন বাড়ীতে বসে ফুসছিল, গজরাচ্ছিলে তোমরাও । আমি নাকি এলোচুলে ভরসন্ধায় গড়িয়ে গড়িয়ে হেসে খুন হচ্ছিলাম ক্লাসমেটদের সাথে । সেখানে ছেলেরাও ছিল । খুব ভালো মুড নিয়ে ফিরে আসছিলাম, চিৎকার করে বলতে যাচ্ছিলাম, সূর্যটা ডুবে গেল, কালকের সূর্যটাই সকালে নিয়ে আসবে নতুন বছরের নতুন প্রভাত । কিন্তু পরিবেশ দেখেই থমকে গেলাম । মাঝ উঠানেই দাঁড়িয়ে গেলাম । আমার ধিঙ্গিপনার অনেক কথা শুনলাম, হজম করে নিলাম, কিন্তু আমার ভিতর রাগ, জেদ, কষ্ট সব আগুন হয়ে জ্বলছিল । দাঁড়িয়ে পায়ের নখ উঠানের মাটি খুঁটছিল । সবাই ঘুমিয়ে গেলে তুমি উঠে গুড়ের সিরায় মুরালী করছিলে, মুড়ি খই আগেই করে রেখেছে, সকালে শুধু পায়েশ আর তেলের পিঠাটা করবে । সন্তর্পনে আমি তোমার চুলার ধারে এলাম, নতুন কাঠ দিলাম সেখানে । আগুনটা আমার রাগের মতই দাউদাউ করছিল । মা বলল, জ্বাল বাতাস না, জানিস না নাকি যে মিঠা জ্বালে পিঠা ভাজতে হয় । জানি, কিন্তু আমার মধ্যে কোন মিঠা কিছু নাই, অতো তিতা কথা শুনলে আর কিছু থাকে না মা বুঝলে ? নিজেদের মত করেই ভাবলে বকলে । আমার ধিঙ্গিপনাটাই দেখলে, আমি কেমন সেটা বুঝলে না । যা ঘুমাতে যা, মেয়েদের অতো রাগ ভালো না । আবার রাগালে ? আবার মেয়েদের বললে, ছেলে মেয়ে সবকিছুতেই আলাদা কেন কর মা ? আমি দেখিয়ে দেব, মনে মনে বলতে বলতে চলে এলাম। কাল তোমরা ওই পিঠা পায়েশ নিয়ে হাহাকার করবে । মা ঘরে এসেছিল, ক্লান্ত শরীরে মার ঘুমিয়ে যেতে সময় লাগেনি । আমি বের হয়ে এসেছিলাম, রিক্সা আর তারপর বাসষ্ট্যান্ড সবই চেনা, অসুবিধা হয়নি । বৈশাখের প্রথম দিন, বছরের প্রথম দিন জনকোলাহলের মধ্যে ঢাকা এসে পৌঁচ্ছালাম । আগেও ঢাকায় এসেছি । এস এস সির পর ঢাকায় এইচ এস সি পড়ব বলে। নামকরা কলেজগুলোয় সিট পাইনি বলে চলে গিয়েছিলাম । যেখানে ছিলাম সে ঠিকানাও আমার কাছে আছে, তখন হোষ্টেলের ঠিকানাও সংগ্রহে ছিল । আসলে যে ঢাকায় আসতে চায় তার জায়গা হয়েই যায় । ঢাকা কাউকে ফিরিয়ে দেয় না । সেই যুগ যুগ আগে থেকে এখানে আসছে, টিনের বাক্স, বেতের সুটকেস, লেদারের কিংবা পোটলা পুটলী নিয়ে, কাউকেই ফিরায় না যদি সে না ফেরে । আমারও জায়গা হয়ে গেল । আর হিল্লেও হয়ে গেল। বছর খানেকের মধে আমি মেয়ে পুলিশ হয়ে গেলাম । জয়েন করে বাড়ীতে মাকে চিঠি দিয়েছিলাম । সেদিন বাড়ীতে কি কি হয়েছিল আন্দাজ করেছিলাম । জানতাম থানা পুলিশ করবে না, আত্মীয়দেরও বলবে না, একটু বিশ্বাস ছিল আমি খারাপ কিছু করব না। প্রেম ভালবাসায় জড়িয়ে যে বের হয়ে যাবার মেয়ে আমি নই সেটা জানতো, তবে যে সবাই মনে মনে কাঁদেনি সেটাও আমি বিশ্বাস করি না। আফসোস করেছিল, কে কে মনে মনে কি বলে দুঃখ করেছিল যেন চোখ বুজলেই দেখতে পাই । তবু জেন আমার যায়নি, ভেবেছিলাম, অনেক ভাইবোনের মধ্যে একজন না থাকলে আর কি হবে ? আজকে কেন ভাবছি ? না তেমন করে ভাবছি না। সকালের পরিবেশটা একেবারে অন্যরকম হয়ে গেল বলে মনটা ভার হয়ে গেল, চোখ দুটোয় পানি আসবে বলে জ্বালা করছিল । ট্রেনিং শেষে আমরা নতুন । রোজ রোজ বিভিন্ন জায়গায় ডিউটি করছি, কাজ শিখছি সিনিয়রদের সাথে থেকে থেকে । এবারের বাৎসরিক কুচকাওয়াজ, মানে ঢাকার রাজারবাগের মাঠে আমার প্রথম ছিল । প্রতিদিন সকাল বিকাল প্রাকটিস, তারপর পুলিশ সপ্তাহের দিন মাঠে। ছোটতে কতোই তো লাফঝাপ করেছি, ট্রেনিংও খুব ভালো করেছি, নিজের উপরেও প্রচন্ড বিশ্বাস আছে, তবু একটু কাঁপুনি হচ্ছিল ধে কি ? কতো গণ্যমান্য ব্যক্তি রয়েছে । আইজি তারপর প্রধান মন্ত্রী দেখবে, টেলিভিশনে সারাদেশের লোক দেখবে, আমার বাড়ীর লোকও নিশ্চয়ই দেখবে তাই একটু ভয় করছিলাম । কিন্তু এবারের প্যারেড ভালো হয়েছে সবাই বলেছিল । আমি অন্ততঃ ভুল পদক্ষেপ ফেলিনি । এরপর থেকেই নিজের উপর সম্পূর্ণ আস্থা তৈরী হয়েছে । আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল বৈশাখের প্রথম দিনে আমার ডিউটি কোথায় । মনে মনে তৈরী ছিলাম । বৈশাখের সূর্যোদয়ের আগেই আমাদের সবাইকেই উঠতে হয়েছে। ভোর রাত চারটায় । আমাদের উঠতে হয়েছে তৈরী হয়ে গাড়ীর জন্য অপেক্ষা, তারপর সকাল ছয়টার আগেই গন্তব্যে । আমরা তিনজন মেয়ে আর বাকী ছেলে মিলে প্লাটুন ধানমন্ডি সুলতানা কামাল স্টেডিয়ামে ডিউটিতে এসেছি । মৃদুমন্দ বাতাস, সারাটা ঢাকায় সাজ সাজ রব । মনে মনে ভাবছিলাম ডিউটিতো করতেই হবে তবে রমনার বটমূলের কাছে হলে ক্ষতি কি ছিল ? কিংবা হতে পারত বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে । আবার এওতো হতে পারত যে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে । হয়নি, হয়েছে সুলতানা কামাল স্টেডিয়ামে । খেলাধুলা করার মাঠে কি বৈশাখী আনন্দ উৎসবের আমেজ পাওয়া সম্ভব ? মনটা খারাপ করছিল, গান শুনতে পারব না, কবিতার আবৃত্তি শুনব না, বেহালা সেতারের বাদন শুনব না, কলকল হাসি, খলখল কথা, ফুল জড়ানো খোঁপা, এলো কেশের দুলানু, লাল সাদা পোশাকের শুভ্র অপরূপ শোভা কিছুই দেখা হলো না । ভাজা ইলিশের ঘ্রাণ পোড়া মরিচের বাঁঝ, পঞ্চদশীর গর্বিত গ্রীবা আমার এ বছর দেখা হলো না পাওয়া হলো না । বাড়িতে থাকতে আমি তো মায়ের পায়ে পায়ে থাকতাম । পিঠায় মিষ্টি হয়েছে কিনা সেটা প্রথম আমিই চাখতাম । তবে এই সব বিশেষ দিনেই আমি যা একটু স্মৃতির ভারে জর্জরিত হই, নয়ত আমি আমার পুলিশ জীবন নিয়ে যথেষ্ট খুশি । এদিন আমার আরও অনেক বিস্ময় লুকানো ছিল, আমার যে এতো আনন্দ পাওয়ার ছিল একটু আগেও তা বুঝতে পারিনি । হঠাৎ বেলী ফুলের সুগন্ধ ভেসে এলো, মুখরিত কয়েকজন যেন উচ্ছল ঝর্ণা । মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম, অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে বারান্দাটা ভরে উঠল, এতো সুগন্ধ, এতো সুবেশ, এতো আনন্দময় সবই যে আমার খুবই ভালো লাগছিল । মনে ভরে উঠছিল । সবার হাতে কোন না কোন পাত্র । প্রথমে বুঝিনি পরে বুঝলাম । প্রত্যেকে কিছু কিছু বৈশাখী খাবার এনেছে। সামনে লক্ষ করে টেবিল পাতা, সেখানে সব খাবার । এখানে টিন এজার থেকে ষাটডার্কাও রয়েছে, কিন্তু কলকাকলীতে সবাই এক । প্রাণবন্যায় কারও চেয়ে কেউ কম বলে মনে হচ্ছেনা । মাথায় ফুলগোঁজা আর ছবি তোলা নিয়ে সবাই ব্যস্ত । আমাদের মেয়েকয়জনকে তারা বারান্দার এক ধারে বসতে বলল । গানে গানে বৈশাখকে আবাহনের পর খাওয়া । সবাই চেয়ারে বসা চার পাঁচজন পরিবেশন করছিল । শুনতে শুনতে বুঝতে পারলাম কতো রকমের খাবার আছে এখানে । পান্তাভাত, গরমভাত, জাউভাত, লালচালের ভাত, আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, ডালভর্তা, সুটকীভর্তা, সুখনামরিচভর্তা, বেগুনভাজা, সজনে ডাটা, ডিমভাজা, মাংসভাজা, হয়ত আরও অনেক কিছু অতো মনে করতে পারিনি । ফির্নি, পায়েশ, মিষ্টি, দই, হালুয়া, তরমুজ, আইসক্রিম পর্যন্ত । যে যার পছন্দমত, যেন ছোটবেলার বনবোজন । "নুরু পুশি আয়শা সফি সবাই এসেছে, আমবাগিচার তলায় যেন তারা হেসেছে ।” এই সুলতানা কামাল স্টেডিয়ামের বারান্দায় সত্যিই যেন তারা হাসছে । আমার সমস্ত দুঃখ মুহুতে উধাও হয়ে গেল, যখন তারা আমাদের জন্য প্লেট সাজিয়ে খাবার দিল । দুচোখে পানি এসে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বাড়ীতে বড়বোনের আদর মাথা হাত । আল্লার কাছে নত হলাম, এই আদরটুকু পেলাম বলে ।
Read Also :-
Labels :
#Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#বর্ষবরণ আমারও ,
Getting Info...