ক্ষরণ

অনামিকা হক লিলি।
একেবারে চুলের গোড়া থেকে পায়ের তল পর্যন্ত শিরশিরিয়ে একটা স্রোত নামতে থাকে। একবার দুইবার বারবার।এ কী হল?এমন তো হওয়ার কথা না।দুঃখে ভয়ে আতঙ্কে গুড়গুড় করে ওঠে বুকের ভেতরটা।পা যেন তাঁর শরীরের ভার বহন করতে অক্ষম।মাথা যেন চীন তা শূন্য হয়ে যাচ্ছে।ফাঁকা ফাঁকা একেবারে মরা মাছের মতো ফ্যাকাশে আকাশ রক্তশূন্য ঠোঁট।পায়ের পাতা।হাতের তালু ঠান্ডা অথচ।কান গরম।কপাল গরম গা গরম যেন তখনই স্তরে এসে গেল।চৈতন্য হারাবার মত।যেন কেন কোন অপমানে কিংবা।এই অবস্থায় নাকি পরাজয়ে গ্লানিতে আপনি মাথা নিচু হয়ে গেল।ঠিক নিচু হয়ে গেল না।নিচু করল নাভিদবেরিয়ে এল। সব দর্শনে বেরিয়ে এল।ঠিক বুঝতে পারল না পাতা কে যেন টেনে নিয়ে এলো আর সে স চলতে থাকল।তার উর্ধ্ব পা প্রান্তের মতো।তাই দিশাহারা বোধ ধারা যেন সর্বহারা সে এমন।তাঁর সব তার স্বাদ তাঁর ইচ্ছা, তার চাওয়া পাওয়া সব যেন হারিয়ে গেছে মুহুর্তে। তাই এতে ফুৎকারে নিভে গেছে সব আলো।উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো কিছুক্ষণ চলার পরে মনে হল আর একটুও হাঁটতে পারবে না সে।সে কি বসে পড়বে কোথাও?কিন্তু কোথায় বসবে সে?কোনও ফুটপাথে কি কোনও ব্রেন চেয়ার রাখা আছে?না কি আছে মুখ?মল সম্ ঘাসযে বসলে হল।কিন্তু বসতে ভীষণ ভয়হত।বসলেই বুঝি চেনা মানুষের ভিড় জমবে।পালাতে চায় না ভিত। পরিচিত সেনা থেকে দূরে যেতে চায়নিজেকে লুকাতে চায় আর একাই নাভিদ চলতে থাকে।চলতে থাকে আর কখন যেভাত বা স্ট্যান্ডে এসে বাসেবসে পড়ে।তাঁর খেয়াল থাকে না।বসতে পেরেতাই আর গতির এইক টা ঝাঁকুনিতে মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে।যেন ঘুম ঘুমনিয়ে আসবে তাঁর।বসতে পেরে দুঃখটা আবার তাড়া করে ফেরে।এর কিছু খোলা হল ওঠানামা আর সমাগমের শব্দ মাঝেমাঝে বাস্তবে ফিরে আসেন নাভিদ।আবার কি এর দুঃখবোধ এ ডুবে যায়?ডুকরে ডুকরে কাঁদে।আপনি কি নামবেন?যাত্রাবাড়ী এসে গেছে।পাশের লোকটির বসায় হক।পাশেরলোকটির কথায়হকচকিয়ে ওঠেননাভিদ।সে যাচ্ছে কোথায়? কোন নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে।বলে না নামব না।সংক্ষিপ্ত হবার পাশের লোক মুখ চোখ দেখেভাবগতিক দেখে গল্পজামাতে সাহস পায় না।যাত্রাবাড়ী।যাত্রাবাড়ী বলেকন্টাকটারডাক দেয়।তাই শব্দগুলো একেবারে মগজের ভিতর পর্যন্ত গিয়ে ঢুকে নাভিদের।অসহ্য লাগে।কপালে রগ দুইটিচেপে ধরে বসে।কাম তো আর সবার সামনে বন্ধ করা যায় না।বাস এগোতে থাকে।যাত্রাবাড়ী ছাড়িয়ে ডেমরা ডেমরা ছাড়িয়ে কাঁচপুর দ্বীপ।বাস চলতে থাকলে বরং ভালো।থামলে জ ত হট্টগোল ঘামের গন্ধ সিগারেটের ধোঁয়া সব মিলে মিশে বড় ভারী হয়ে যায়।দুফোঁটা পানি কী বের হল চোখ দিয়ে।ধাঁধা করে চলেছে চোখ।পানিবের হলেও বুঝি ভালো।লাগত একটু হাল্কা হওয়া যেত।এত পুরুষ তবু কাঁদে বিশ্বস্তপুরুষ।কান্নায় তাদের সবচেয়ে লোহা নাভিদ কাঁদতে পারে না কিছুতেই।এর আগে কবে কবে কেঁদেছে ফিরে ফিরে মনের তরে সে।এর চেয়ে অনেক কমদুঃখে ও কম কষ্টে ও কেঁদেছে।আর আজ যেখানে সে দিশেহারা ভবিষ্যৎ অন্ধকার অনিশ্চিত সে দেশে বড় নির্বিকার হয়ে বসে আছে।পাশের ভদ্রলোক আবার একটু সাহস করে বলে।আপনি কি ম্যাম না ঘাটের দিকে যাবেন।নাকি বাসে নরসিংদীতে?কে যাওয়ার কথা ছিল।তার ডাইনে অদম হি নগর কিন্তু পার হয়ে এসেছি।ওখানে যেতেন কী?যেভাবে মুখ ঢেকে বসে আছেন।হয়তো নাম্বার জায়গা ছাড়িয়ে চলে যাবেন।লোকটার সেধে সেধে কথা বলাতে বিরক্ত লাগে না ভিদের।অন্য দিন হলে তো খেঁকিয়ে উঠত।আজকিন্তুইচ্ছা করে না বলতে। বরং শেষ কথাটা আবার ভেসে উঠে মনে।কোন নাম্বার জায়গা ছাড়িয়ে চলে যাবেন?কোথায় নামবে সে আর কোনও জায়গায় বা ছাড়াবে সে কি জানে তো।আজকে বরং সবাই তাঁকে ছাড়িয়ে গেল।সে পড়ে রইল পিছনে।সবাই তাঁকে ছাড়িয়ে গেল।ছাড়িয়ে গেল,এই কথাটাই অণুরণিত হতে থাকল।পাশের লোকটাকে আর অসহ্য মনে হয় না নাভিদের।বরং ভালোই বলেছে।ছাড়িয়ে যাবার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।সে পারল না আসে পারল না।উচিত ছিল।কিন্তু তাঁরপারবার কথা ছিল।বড় বেশি নিশ্চিত ছিল সে।পাবার অধিকার আছে তাঁর।অবশ্যই তাঁর পাবার উচিত ছিল।ভাবতে গেলে আবার জ্বালা বাধে জমে ওঠে ভিতরে।দুঃখে খুব পেয়ে বন্ধুদের মুখগুলো শক্ত হয়ে যায়।মনে হয় প্রতিদ্বন্দ্বী।প্রতিদিন।ভীষণ এ কটা হে লা মি। আমি বোধ করে ভিতরে ভিতরে। কানে স্যাম ভাসতে থাকে ওদের সহানুভূতি ভরা কথাগুলো।আর অত ভাবছিস কেন? কিছু একটাহবেই কথাগুলো তেমন কিছুই না।সাধারণ স্বাভাবিক কথা, তবু উদ্ধত মনে হবে নাবিদের কাছে।তাই না ভিড় সরে আসছে দূরে থাকছে।অনেক আজকে ওদের বড় অহংকারী মনে হবে নাবীদের।এবার বুঝি গলা ভারী হয়ে কান্না আসতে চায় না ভিদের।।পাশের লোকটি বলে।কী সুন্দর মোট।বাতাসে।আপনি পাচ্ছেন না।বিসকুট চকলেটের ফ্যাক্টরির কাজদিয়েতাই গেলে যেমন সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায় সেগুলোর এখানে।পাউডার শ্যাম্পু স্নো গন্ধ পাওয়া যায়।তাই একটু মুখ তুলে দেখেন না।ডান হাতে আমরা কিউট পল্লী স্যার সি ই এখন।নাভিদ বড় করে এ কটানিঃশ্বাস ছাড়ে।সেন্ট এর চেয়ে বরং একটু এগিয়ে অ কেহ রেললাইন টার তাঁকে টানে।নারায়ণগঞ্জ আর নরসিংদীর মাঝে পরিত্যক্ত রেললাইন।সেও পরিত্যক্ত হয়ে গেল আজ।তো আসায় গড়েছিল লাইন।ভেবেছিল জীবনের ঘাটে ঘাটে পৌঁছে যাবে তরতর করে।সাফল্যের স্টেশনে বড় জংশনে গিয়ে দম নিয়ে আবার চলবে।আসলে শুধু এই ভয়ের যাত্রায় হবে তাঁর চলা।রেললাইন টার মতোই অহেক ,তাঁর সামনে চলার পথ রুদ্ধ। তাঁর লোহার পাতে ধরবে জং।কাঁধে ধরবে ক্ষয় ঘুম দুপাশে জমবে কাঁটাঝোপ আগাছার জঙ্গল।নিঃশ্বাস আরও ভারী হয়ে ওঠে।বাঁশ হারিয়ে যায়।রৌদ্রের বাহার ডানা আর এলাকাকে পিছে ফেলে সামনের সোনারগাঁ নামবে কি?ভাবতে না ভাবতে নেমে পরে বাসে বসেই বা কী হবে?তাই আশ্চর্য। পাশের লোকটি ও এখানে নামে।আর বলে এখানে নামবেন? অথচ এত ক্ষণ বলেননি। দিব্যি গল্প করতে করতে আসা যেত।আমার তো বাড়ি সোনারগাঁ।এর কারণে প্রায় ডে লি পেশেন্স জারি করি।আর আপনার তো? শহরের হাঁফ ছাড়তে পালিয়ে আসেন।এ তো কষ্ট হু করে কী যেন এটা বলে না ভিত।লোকটার উপরে রাগকরতে পারে না।ভদ্রলোক তো ঠিকই বলছে, পালিয়ে আসে এখানে সবাই।হট্টগোল ভিড়।থেকে ঢাকার ব্যস্ততা থাকে।কিন্তু নাভিদ পালিয়ে এসেছে পালানোর জন্য নয়।সে মুখ দেখাবে কী করে?কী করে মা বাবার ছোট বোনের সামনে গিয়ে দাঁড়াব।কত আশা নিয়ে আজকে বসেআছে ওরা। ওদের আশা পূরণ করতে পারে কিনাভিদ।একটু হেঁটেইবাঁধানো গাছের গুঁড়িতে এ বসে পড়েন নাভিদ।আর হাঁটতে চলতে যেতে ভাবতে কিছু ইচ্ছা করে না তার।ভদ্রলোক বিদায় নিয়ে চলে যায়। এগিয়ে মাথা তুলে তাকায় নাভিদ।ভদ্রলোকের চলায় নাভিদ যেন তাঁর বাবার ছায়া দেখতে পায়।কী ভাবছে আজ তাঁর বাবা।বাবা নিশ্চয়ই এতক্ষণ বোর্ডে টাঙানো লিস্টটা দেখে গেছে।নিশ্চয় বারবার খুঁজছে।চশমা গ্লাস মুছে নিয়ে আবার খুঁজতে নম্বারটা। শেষে ব্যস্ত হয়ে হয়তো দেখেছে ওয়েটিং লিস্ট আও।তার পর বাবা বাড়ি ফিরতে পেরেছে তো।বাবারউদান্ত অবস্থা দেখে।মারই বা কী অবস্থা হয়েছে?মার প্রশ্নে কী জবাব দিয়েছে বাবা?রেগে গিয়ে বলেছে কী?মেডিক্যালে যেমন হয়নি তেমন আঁশ বুয়েটও হয়নি।মাকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছে।কপালে নাই তার।মা কি করছে জেনে?কেঁদে ভেঙে পড়েছে কি?নানাকি বন্ধ শিলার মত বলেছে।ভালো ছেলেদের অন্যত্র পরা উচিত।মন আগেও বলতে শুনেছে সে।যে অন্য বিদ্যাপীট মেধাশূন্য হয়ে যাবে না হলে।সবচেয়ে বেশি কষ্ট কি? তাহলে ওরবোন টাই পেয়েছে।যে সবসময় বলে আমি ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার বিয়ে করব।ভাইয়া তুই আমার বরের ওপর টিকা দিবি তা হবে না ,এ বারে আর কান্না চাপতে পারে না নাভিদ। মুখে রুমাল চেপে ঢুকলে ওঠে।মা বাবা ভাই বোন মিলে সোনারগাঁয়ে লাউও বসে।না ন মুরগী খাবার কথা ছিল।একেবারে ডেট শিওর ছিল বলে প্রোগ্রাম করা ছিল আগে।অথচ নাভিদ এখন বিক্রমপুর।এর সোনারগাঁয়ে।তাঁর ছোটবেলার মতো হিক্কা তুলে কান্না আসেনাভিদের।কতক্ষণ কেঁদেছে জানে না।হঠাৎ মাথায় হাতের পরশ হাত দুইটি ধরে। বাবা বাবা করে কেঁদে উঠে নাভিদ।একটু দূরে গিয়েই ভদ্রলোকের খটকা লাগায় তিনি ফিরে আসেন আর নাভিদকে কাঁদতে দেখে।মাথায় হাত রাখেন তিনি।কী বলে সান্ত্বনা দেবেন? কিছুই বোঝেন না।শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে যান স্নেহে যতক্ষণনা শান্ত হয় নাভিদ।শেষে বলেন।বাড়ি যাও বাবা।না হলে বলো তো আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি তোমার বাড়ি পর্যন্ত।তাই নাভিদ আর সামলাতে পারে না নিজেকেভদ্রলোক কে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে।তাই বলতে থাকে তার অকৃতকার্য ওর কথা।বাবার আশা ভঙ্গের কথা।বন্ধুদের করুণা করা দৃষ্টির কথা।সমবেদনা দেখানোর সম্ভাব্য সব কথা।তারপর আর বলতে পারে না।ভদ্রলোক যেন কত আপন তার বুকে মাথা রেখে মারহীন নরম পান দই পাঞ্জাবিতে চোখ মুছতে থাকেনাতা। ভদ্রলোক নাভিদকে হওয়ার সময়তা দেখে তারপর বলে।সন্ধ্যা তো প্রায় হয়ে এল বাবা।এক বা তোমার মায়ের কথা ভাবো দেখি। ঘর বারঘরবার করতে করতে দুশ্চিন্তার যেন পর্যায়ে তিনি আসেন। তোমার বাবা যদি উদ্দেশ্য উন্নীত হয়ে।তাহলে খোঁজ করেন তোমার কিংবা খুঁজতে পুলিশে খবর দেন। তাহলে কী দেখেই হবে।তিনি হয়তো হাসপাতালে।এ বয়সে প্রেশার বেড়ে দুশ্চিন্তায় স্ট্রোক হতে কতক্ষণ?বোনটার মুখটা একবার ভাবো।কী করবে কিছুই বুঝতে না।না বাবার কাছে যেতে পারছেন আমার কাছে না কিছু খেয়েছে দিনভর।শুকনো মুখে বসে আছে হয়তো জানালার ধারে।সেখান থেকে তোমার ফিরে আসা দেখে আনন্দে চিত্ কার করে উঠবে।জীবনের অনেক পথ তো বাকি।সাফল্য যেখানে দেখিও বাবা।নাভিদ, ঢাকাগামী বাসে উঠে বসে।পাশের সিটটা সেই ভদ্রলোক নাভিদের গা ছুঁয়ে থাকে।
Read Also :-
Labels :
#Bangla Golpo ,#Bangla Kobita ,#Bangla Romantic Story ,#Love Quotes ,#ক্ষরণ. Bangla Golpo ,
Getting Info...